গ্রেফতার হলো আরেক শীর্ষ রাজাকারঃ সাকাচৌ

সকলকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা, সেই সাথে সকল মুক্তিযোদ্ধা ও বিরাঙ্গনাদের প্রতি আমার অসীম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। আজকের এই বিজয় দিবস আর অন্যান্য সব বিজয় দিবসের মতো নয়, আজ যেন সত্যিকার অর্থে বিজয়ের স্বাদ পাচ্ছি। বর্তমান সরকার আমাদের এই বিজয় দিবসে আমাদের এক ভিন্ন ধরনের উপহার দিলেন। গ্রেফতার করলেন আরেক কুলাঙ্গার, নরপশু, সাকাচৌ কে। যাকে সবাই সাকা চৌধুরী নামে জানেন, অনেকে হয়তো চট্টগ্রামের টেরর হিসেবেও অনেকেই চিনেন/জানেন। সে আর কেউ নয়, সাবেক নেতা, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বা সংক্ষেপে সাকাচৌ।

আমার মাঝে মধ্যেই সাকার মতো এইসব রাজাকারদের কথা চিন্তা করে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যেতো। যে ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্পূর্ণরূপে দেশদ্রোহী হিসেবে কর্মকাণ্ড চালিয়েছিলো, সেই একই ব্যক্তির কিভাবে আমাদের এই স্বাধীন দেশের স্বাধীন মাটিতে নেতা হয়ে নির্বাচন করে সংসদে পা রাখার স্পর্ধা হয়? কি করে সে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পায়? কি করে এই দেশদ্রোহী আমার দেশের মুক্তিযোদ্ধার চোখের সামনে সরকারী গাড়িতে আমার স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে চলে? কিভাবে সে সাত-সাত বার নির্বাচিত হয় সাংসদ হিসেবে? এই প্রশ্নগুলো আমি আসলেই মেলাতে পারিনা। বড়ো অসহায় লাগে মুক্তিযোদ্ধাদের কথা চিন্তা করে, আহারে, এইসব দিন দেখার জন্য বুঝি বুকের রক্ত ঝড়িয়েছিলেন? আজকের এই পরিস্থিতির জন্য আমি পুরোপুরি সাবেক রাজনৈতিক দল, বিএনপিকে দায়ী করবো। কিভাবে এতো বাঘা বাঘা রাজাকারদের তারা গদিতে বসিয়ে সাধারন মানুষদের অপর এই অনাচার চালালো তা ভেবেই কুল পাইনা।

বর্তমান সরকারের প্রতি রইলো আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। এক এক করে সবকটি রাজাকারদের বিচারের আওতায় এনে সর্বচ্চো শাস্তি প্রদান করবে এই আশাই এতো দিন ধরে বুকে পুষে রাখছিলাম, আজ তা দেখতে পাচ্ছি। ভেবে আসলেই খুবই ভালো লাগে যে, আওয়ামী সরকার নির্বাচনকালে শুধু রাজাকারদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করার  প্রতিশ্রুতি দিয়েই বসে থাকেননি, বরং এক এক করে রাজাকারগুলোকে গ্রেফতার করছেন, বিচারের আওতায় আনছেন। শুধুমাত্র এই দিক থেকে বিবেচনা করলেও আমি আশাবাদী অনেক, পরিবর্তন আসবেই, এবং আসছে, আমরা দেখছি।

আসুন সংক্ষেপে দেখে নেই এই নরঘাতক সাকার ইতিহাসঃ

এই সেই দালাল, যে ৭১ সালে আমাদের দেশ ও দেশের মানুষের বিরুদ্ধে গিয়ে পাক-হানাদার বাহিনীর সাথে আতাত করে খুন করেছে অসংখ্য মানুষকে, ধর্ষণ করেছে আমাদের মেয়ে, বোন, মায়েদের। অগ্নিসংযোগ করেছে স্বাধীনকামী মানুষের বাসা-বাড়িতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চালিয়েছে ব্যাপক কার্যক্রম, বিভিন্ন হত্যাযজ্ঞে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছিলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনিদের। মূলত চট্টগ্রামেই এই সাকা নামের এই নরঘাতক চালিয়েছে তার যতো কুকর্ম। এই সাকা চৌধুরীর চট্টগ্রামের বাসভবন গুডসহিলের সম্পর্কে মোটামোটি সবাই অবগত আছেন। অনেক স্থানীয়রা এখনো গুডসহিলের নাম শুনলে ভয়ে শিউরে ওঠেন। নৃশংসভাবে হত্যাজজ্ঞ চালাতো তার এই গুডসহিলে। কোন এক বইতে পড়েছিলাম,

সাকার সাঙ্গোপাঙ্গরা ১৯৭১ সালের ৫ই এপ্রিল চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার রামজয় মহাজন লেনের বাসভবন থেকে শান্তি কুসুম ও মতিলাল চৌধুরী, মতিলালের কর্মচারী সুনীল সহ আরও ৬ জনকে ধরে নিয়ে যায় সাকার গুডসহিলে। প্রচন্ড আহত অবস্থায় সুনীলকে ছেড়ে দেয় কিন্তু কখনো খোঁজ মেলেনি মতিলাল চৌধুরী, শান্তি কুসুম কিংবা সাথের বাকি লোকদের।

এই নরপিশাচের ভয়াল থাবার হাত থেকে বাচার জন্য তৎকালীন সময়ের চট্টগ্রামের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতেন। একদিন হঠাত সাকা ও তার সহচর আবু মাবুদ রাউজানের জগৎমল্লপাড়ায় কিরণ বিকাশ চৌধুরীর বাসায় শান্তি কমিটির মিটিং বলে আশেপাশের সকল হিন্দুদের জড়ো করলো এবং সবাই জড়ো হলে কিছুক্ষনের মধ্যেই সাকা পাকিস্তানি হানাদারদের নিয়ে অতর্কিতে সবার ওপর ব্রাশফায়ার করে এবং তাতে  ঘটনাস্থলেই তেজেন্দ্র লাল নন্দী, সমির কান্তি চৌধুরী, কিরণ বিকাশ চৌধুরীসহ ৩২ জন নিহত হন। ঠিক ওই দিনই বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে রাউজানের ঊনসত্তরপাড়ায় গণহত্যা চালায় সাকাচৌ। সাকার উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ব্রাশফায়ারে চরণ পাল, বাবুল মালীসহ ৭০ জনকে হত্যা করে। একই এলাকার ক্ষিতিশ চন্দ্র মহাজনের বাড়ির পেছনে পুকুরপাড়েও ডাকা হয় শান্তি কমিটির সভা। ওই সভায় হত্যা করা হয় ৭০ জনের বেশি ব্যক্তিকে।

একই সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মোজাফফর আহমেদ ও তাঁর ছেলে শেখ আলমগীরকে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ড থেকে ধরে স্থানীয় সেনাক্যাম্পে নিয়ে যায় সাকা চৌধুরী ও তার সহচররা। নৃশংসভাবে নির্যাতন চালিয়ে তাঁদেরকে হত্যা করে এই নরঘাতকের দল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মাত্র পাঁচ মাসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ৪৩৭ জন ব্যক্তিকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হত্যা করে সাকা চৌধুরী। শুধু রাউজানেই ৯টি গণহত্যা চালানো হয়েছে। সাকা চৌধুরীর উপস্থিতি ও নির্দেশে তাঁর সহযোগীরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে এসব গণহত্যা চালাতো। মূলত হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নিশ্চিহ্ন করার জন্যই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয় বলেই ধারনা করেন স্থানীয়রা।

‘৭১ সালের ২০শে এপ্রিল কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী, সাকা চৌধুরী, তার অনুসারী, মুসলিম লীগ সমর্থক রাজাকার খয়রাতি, জহির, জসিজ ও পাকবাহিনী যোগসাজশ করে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালি থানার হিন্দু অধ্যুষিত শাকপুরা গ্রামে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে সেখানকার হিন্দুদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে নির্বিচারে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে শাকপুরা প্রাইমারি স্কুলের রাস্তার পাশে শাকপুরা গ্রামের নিহতদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। সেখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং তার সহযোগীদের হাতে শহীদ ৭৬ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে। এরা হলেন – ফয়েজ আহম্মদ, জালাল আহম্মদ, হাবিলদার সেকেন্দার আলী, আমীর হামজা, আবুল হাশিম, আব্দুল মতিন, হাবিবুর রহমান (লেদু), আহাম্মদ ছফা, অরবিন্দ রায়, নিকুঞ্জ রায়, ধীরেন্দ্র লাল দে, ফণীন্দ্র লাল শীল, নিকুঞ্জ শীল, প্রাণহরি শীল, নগেন্দ্র লাল শীল, দেবেশ চৌধুরী, গৌরাঙ্গ প্রসাদ চৌধুরী, বিশু চৌধুরী, গৌরাঙ্গ নন্দী, তপন নন্দী, ডাক্তার মধুসূদন চৌধুরী, রঘুনন্দন চৌধুরী, নিরঞ্জন চৌধুরী, সুখেন্দ্র বিকাশ নাগ, রবীন্দ্র লাল চৌধুরী, উপেন্দ্র লাল চৌধুরী, নিরঞ্জন চৌধুরী, বিশ্বেশ্বর আচার্য, দয়াল হরি আচার্য, কামিনী শুক্ল দাস, যোগেন্দ্র লাল শুক্ল দাস, দেবেন্দ্র শর্মা, যতীন্দ্র লাল সেন, ধুর্জ্জটি বড়ুয়া, পন্ডিত রমেশচন্দ্র বড়ুয়া, রতন চৌধুরী, প্রিয়তোষ চৌধুরী, চন্দন চৌধুরী, নিরজ্ঞন চৌধুরী, হরিরঞ্জন চৌধুরী, দীলিপ চৌধুরী, মিলন বিশ্বাস, সুবল বিশ্বাস, ব্রজেন্দ্র লাল চৌধুরী, গোপাল চৌধুরী, ধীরেন্দ্র চৌধুরী, রমণী চৌধুরী, গৌরাঙ্গ চৌধুরী, দয়াল নাথ, রাখাল সিংহ, মনমোহন চক্রবর্তী, শশাঙ্ক ঘোষ, সুখেন্দ্র বিকাশ চৌধুরী, ধীরেন্দ্র লাল চৌধুরী, বরদা চরন চৌধুরী, মণীন্দ্র লাল খাস্তগীর, বঙ্কিমচন্দ্র সেন, সাধন ঘোষ, গৌরাঙ্গ চৌধুরী, ধনঞ্জয় কৈবত্য, নলিনী কৈবত্য, সমিত রঞ্জন বড়ুয়া, নারায়ণ চৌধুরী, যতীন্দ্র লাল দাস, মণীন্দ্র লাল দাস, রমেশ চৌধুরী, ডাক্তার সুখেন্দু বিকাশ দত্ত, প্রদীপ কান্তি দাস, রায় মোহন চৌধুরী, হরিপদ চৌধুরী, অমল চৌধুরী, ডাক্তার পূর্ণ চরণ, মদন কুমার দাস।

আরও একটি ঘটনা বলি, ‘৭১ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের কৃতী পুরম্নষ নতুন চন্দ্র সিংহ তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত রাউজানের কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ে কাজ করেছিলেন, হঠাত করে হত্যাযজ্ঞ করতে সেখানে ঢুকে পড়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর লোকজন। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য নতুন সিংহের কল্যাণকর্মের কার্যক্রম দেখেশুনে ফিরে যায় পাকসেনা ক্যাপ্টেন বালুচ। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সাকা চৌধুরী ও তার বাবা ফকা চৌধুরীর নেতৃত্বে ফিরে আসে সেই বাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে মন্দিরে আশ্রয় নেন সৃষ্টিকর্তার কাছে, প্রার্থনা শুরু করেন। রাজাকারের দল মন্দির থেকে নতুন সিংহকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে টেনেহিঁচড়ে পাকবাহিনীর পায়ের কাছে ফেলে দেয়। পাকবাহিনী গুলি করতে বিলম্ব করলে, সাকা নিজেই নতুন চন্দ্র সিংহের বুকের পাঁজরে, বাম চোখের নিচে ও বাহুতে উপর্যুপরি গুলি করে হত্যা করে।

সাকার গুডসহিলের নির্যাতন থেকে বাঁচতে পারেননি তৎকালীন রয়টারের সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন ও। তাঁকে গুডসহিলের বাসায় আটকে রেখে টানা ১৪ চালানো হয় নির্মম অত্যাচার। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একাত্তরের জুলাইয়ে মিরাজনগরের হাজারী লেনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বৈঠককালে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা এসে আমাদের ঘিরে ফেলে এবং গুডস হিলের বাড়িতে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে ১৪ দিন বন্দী করে রেখে চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। গুডসহিলে অসংখ্য বন্দী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত তখন ওরা বাপ-বেটা মিলে প্রস্রাব করে মুক্তিযোদ্ধাদের পান করতে বাধ্য করত। তিনি আরও বলেন, সাকার গুডসহিলের বাসভবনে নির্যাতনের জন্য একটি কক্ষ ছিলো এবং সেই কক্ষে একটি টেবিলে গাঁথা ছিল তিন ইঞ্চি মাপের অনেকগুলো পেরেক (লোহা)। মুক্তিযোদ্ধাদের সেই পেরেকের ওপর শুইয়ে ওপর থেকে তক্তা দিয়ে চেপে ধরা হতো এবং এতে বন্দী মৃক্তিযোদ্ধাদের সারা শরীর হয়ে যেতো ক্ষতবিক্ষত।

একাত্তর সালের সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করে আহত করেন রাজাকার সাকা চৌধুরীকে। পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরবর্তীতে সাকা পাকবাহিনীর সহায়তার লন্ডনে পলায়ন করে। পরে ১৯৭৫ সালের আগস্ট ট্র্যাজেডির পর মেজর জিয়ার সহযোগিতায় বাংলাদেশে ফিরে আসে।

সাকাকে ঘিরে এরকম রয়েছে হাজার হাজার তথ্য, গা শিউরে ওঠা গল্প। যা লিখতে বা বলতে গিয়েও বারবার নিরবে অশ্রুচ্ছল চোখ মুছি একান্তেই। তবুও আমি বিশ্বাস করি একদিন বিচার হবেই এই ঘাতক পশুদের। অনেক মুক্তিযোদ্ধা বা সাকার দ্বারা নির্যাতিত বা নির্যাতিতদের পরিবার হয়তো দেখে যেতে পারবেন না এই ঘাতকের বিচার, কিন্তু আমাদের মতো মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম অবশ্যই দেখবো সাকা সহ অন্যান্য রাজাকারদের সর্বচ্চো বিচার। সরকারকে আবারো সাধুবাদ জানাই এই সকল নরঘাতকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য। সকল দেশদ্রোহী রাজাকার-ঘাতক-দালালদের বিচারের দাবী রইলো।