যুদ্ধাপরাধের আরেক নামঃ আব্দুল কাদের মোল্লা

kader-cover১৯৭১ সালে কাদের মোল্লা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করেছিলেন তা আমাদের সবারই জানা। রাজধানী ঢাকার মিরপুরের সবাই কাদের মোল্লাকে কসাই কাদের বলেই জানে এবং ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ওই এলাকার সবাই কসাই কাদেরের নামে ভীত সন্ত্রস্ত থাকতো সব সময়।

আমি আজ এই কসাই কাদের নামে কুখ্যাত রাজাকারটির কিছু অপরাধ আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবোঃ

পল্লব হত্যাকাণ্ড: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে কাদের মোল্লার নির্দেশে তার সহযোগীরা মিরপুর ১২ নম্বর থেকে ১ নম্বরে শাহ আলী মাজার পর্যন্ত টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। সেখান থেকে পল্লবকে আবার টানতে টানতে মিরপুর ১২ নম্বরের ঈদগাহ মাঠে নিয়ে যায় এবং সেখানে একটি গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখে। তারপর ৫ এপ্রিল কাদের মোল্লার নির্দেশে তার সহযোগী আখতার পল্লবকে গুলি করে হত্যা করে।

কবি মেহেরুননিসা হত্যাকাণ্ড: ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ মিরপুর ৬ নম্বরে কবি মেহেরুন্নিসার বাসায় যায় কাদের মোল্লা ও তার সহযোগীরা। সেখানে তাঁরা মেহেরুননিসা, তাঁর মা এবং দুই ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন।

খন্দকার আবু তালেব হত্যাকাণ্ড: খন্দকার আবু তালেব পেশায় ছিলেন একজন সাংবাদিক। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ বিকেলের দিকে কাদের মোল্লা ও তাঁর সহযোগী আলবদর-রাজাকাররা আবু তালেবকে মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের বাসস্ট্যান্ড থেকে আটক করেন। পরে জল্লাদখানা পাম্পহাউসে নিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয় আবু তালেবকে।

ঘাটার চর ও ভাওয়াল খানবাড়ি হত্যাকাণ্ড: ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর সকালে ঢাকার কেরানীগঞ্জের ভাওয়াল খানবাড়ি এবং ঘাটার চরে (বর্তমানে শহীদনগর) হামলা চালিয়ে নিরস্ত্র শতাধিক গ্রামবাসীকে হত্যা করেন কাদের মোল্লা ও তার সাথে থাকা আরও ৬০-৭০ জন রাজাকার।

আলুব্দীতে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ: ১৯৭১ সালের  ২৪ এপ্রিল অর্ধশতাধিক অবাঙালি ও রাজাকার নিয়ে কাদের মোল্লা যৌথ হামলা চালায় মিরপুরের পল্লবী থানার আলুব্দী (আলোকদী) গ্রামে এবং তাদের গুলিতে অন্তত ৩৪৪ জন বা তারও বেশি গ্রামবাসী মারা যান।

হযরত আলী লস্করসহ পাঁচজনকে হত্যা, ধর্ষণ: ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় কাদের মোল্লা, তাঁর সহযোগী কয়েকজন অবাঙালি ও পাকিস্তানি সেনাকে নিয়ে যায় মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনে হযরত আলী লস্করের বাসায়। সেখানে কাদের মোল্লার সহচররা কাদের মোল্লার নির্দেশে গুলি করে হত্যা করে হযরত আলীকে। তারপর তারা এক এক করে হযরত আলীর স্ত্রী, দুই মেয়ে ও দুই বছরের এক ছেলেকে হত্যা করে। কাদের মোল্লা তার প্রায় ১২ জন সহচর নিয়ে গণধর্ষণ করে হযরত আলীর ১১ বছরের মেয়েকে।

কাদের মোল্লার হাজার হাজার অপরাধগুলোর মধ্যে সময় সল্পতার জন্য অল্প কয়টি অপরাধ আজ তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। উপরের ঘটনাগুলোর বিবরণ আসলে আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না, এই লিখাটি লিখার সময় আমি বার বার পল্লব, মেহেরুন্নিসা, তালেব, হযরত আলী লস্কর, লস্করের স্ত্রী, মেয়ে এঁদের কথা ভেবে মনের অজান্তেই চোখ বেয়ে পানি বেরিয়েছে অসংখ্যবার।

নরপশু কাদের মোল্লার এই সকল অপরাধগুলোই প্রমাণিত অপরাধ। দেশ স্বাধীন হওয়ার এতো বছর পরেও এসব অপরাধের সাক্ষী, আলামত সবই পাওয়া গেছে। আমার আফসোস হয়, বারবার রেগে উঠি এই ভেবে, যে কাদের মোল্লার মতো দেশদ্রোহী লোক স্বাধীনতার পরেও কিভাবে রাজনীতি করেছে আমাদের এই স্বাধীন দেশে। কিভাবে সে আমাদের সবার চোখের সামনে দিয়ে রাজার হালে তার জীবনের এতোটা দিন পার করেছে? কিভাবে সে আমাদের দেশের পতাকাবাহী সরকারী গাড়ি করে চড়ে বেরিয়েছে সারা দেশ জুড়ে? এসবই সম্ভব হয়েছে রাজাকার/আলবদরের দোসর জামায়াতে ইসলামী নামের এই ধর্মের নামে অপরাধীদের আড়াল করা দলটি। যে দল বাংলাদেশের সুচনালগ্নেই দেশের বিরুদ্ধে কাজ করেছে, সে দলের কাছ থেকে এর বেশি কিছু আশা করাটাও অবশ্য উচিত না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বাতিল করা হলেও আমাদের স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি জিয়া ১৯৭৬ এর সময় উন্মুক্ত করে দেন সকল ধরনের রাজনীতি, এবং তার পরেই জামায়াতে ইসলামির মতো দেশদ্রোহী এই দলটি বাংলাদেশের স্বাধীন মাটিতে মাথা চাড়া দিয়ে উঠবার সুযোগ পায় এবং তাদের দ্বারাই আড়াল হয় কাদের মোল্লা, নিজামি, মুজাহিদের মতো কুখ্যাত রাজাকারগুলো।

সবশেষে শুধু এটুকুই বলবো, বাংলাদেশের ৭১ এর সময়ের মূলনীতি অনুযায়ী, সকল ধরনের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পুনরায় বাতিল ঘোষণা করা হোক এবং দাবি কাদের মোল্লার প্রমাণিত মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি।