যেভাবে হোল কাদের মোল্লা থেকে কসাই কাদের

কাদের মোল্লা যে কসাই কাদের তা সর্বপ্রথেম উঠে আসে তরুন কিছু সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী রিপোর্টে। জামায়েত ইসলামের সাবেক নেতা এই খুনি, ধর্ষক, নরঘাতক মিরপুরের কসাই কাদের ৭১ যে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল তার বিবরণ শুনলে সবার গায়েই কাটা দেবে। এই কসাই কাদের মোল্লা ধরে ধরে রামদা দিয়ে মানুষ জবাই করত। জবাই করার সময় বলত গলার একটু নিচে, উঁচা মাংসপিণ্ডের নিচে একটা পোঁছ দিবি, ছাটাইতে ছাটাইতে মইরা যাবে। কি নির্মম! কি ভয়াবহ ভাবে মানুষদের জবাই করত এই মিরপুরের কসাই এলাকাবাসী প্রত্যক্ষদর্শীরা  সেগুলর বর্ণনা করেছেন।

কাদের মোল্লা মিরপুরের বাসিন্দা ছিলেন। জন্ম আর বেড়ে ওঠা তার মিরপুরেই। কসাই কাদের এর বাবা কাজ করতেন দৈনিক ইত্তেফাক এ।নরঘাতক এই কসাই কাদেরের কীর্তিকলাপ তুলে ধরা সেই তরুন সাংবাদিকদের মধ্যে ইমন শিকদার ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তার কিছু লেখা এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আনদলনের প্রথম পর্যায়ে অন্যতম মুখপত্র পত্রিকা সাপ্তাহিক প্রিয় প্রজন্মের থেকে তুলে ধরছি।

“ঘটনাটা ১৯৯৪ এর মাচের্র শেষ দিকের কোন এক রাতের। আমি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাবাসিক ছাত্র। সে রাতে বাড়িতেই ছিলাম। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে সাংবাদিক, ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির তৎকালীন অন্যতম তুখোড় সংগঠক জুলফিকার আলি মাণিক ভাই বাসায় আসেন। সঙ্গে তার এক বন্ধু। আমাকে এসে বলেন, বারী ভাই(ফজলুল বারী) পাঠিয়েছেন। একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে আপনার সহযোগিতা লাগবে। এ ব্যাপারে মিরপুর এলাকায় বিশ্বস্ত-নির্ভরযোগ্য হিসাবে বারী ভাই আপনার নাম দিয়েছেন। সে কারনে আমরা আপনার কাছে এসেছি। সে সময় আমি ‘প্রিয়প্রজন্ম’ নামের সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করতাম। পত্রিকার সম্পাদক ফজলুল বারী ভাই পাঠিয়েছেন শুনে মনে করি এ আমার নতুন এক এ্যাসাইমেন্ট! যাদের হাতে আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি, সাংবাদিক যাদের সঙ্গে প্রথম বন্ধুত্ব, বিড়ি খাওয়া সহ সবকিছুর শেয়ারিং হয়, তাদের অন্যতম হলেন বারী ভাই। তাই তার কথা শুনে আমি শুরুতেই রাজি।

প্রাথমিক আলাপচারিতার পর মাণিক ভাই আমাকে একটি দায়িত্ব দেন। তাহলো, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নের্তৃত্বে গঠিত ‘গণতদন্ত কমিশন’-এর পক্ষে একাত্তরের ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী রাজাকার আব্দুল কাদের মোল্লা’র যুদ্ধাপরাধের স্বাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের। এ ব্যাপারে কী কী করতে হবে, এ ব্যাপারে সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানের প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিয়ে মাণিক ভাই অল্পক্ষণের মধ্যে চলে গেলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমি এ দায়িত্বটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেই। এলাকায় আমার অগ্রজ, বন্ধুতুল্য মাহবুব আলম শাহীন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে রাতেই আমি নেমে পড়ি তথ্যানুসন্ধানের কাজে ।
প্রথমে আমরা গেলাম একজন বৃদ্ধের কাছে। তিনি আমাদের এলাকার একজন বই বিক্রেতা। শিশুতোষ বইওয়ালা হিসেবে তার বইয়ের দোকানটি এলাকায় আমাদের সবার প্রিয় আড্ডাস্থল ছিল। ‘শহিদুর রহমান’ নামের এ বই পাগল মানুষটির কাছে গিয়ে বললাম, ‘খুব কম সময়ের মধ্যে আমাদের গুরুত্বপূণ কিছু কাজ করতে হবে। আপনার সাহায্য লাগবে।’ ‘মুক্তিযুদ্ধে’র কথা শুনে তিনি মূহুর্তেই রাজি হলেন। আমরা বেরিয়ে পড়লাম তার সাথে । রাতে তিনি তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফিরোজ আলীর মিরপুর ১১নং সেকশনের বি ব্লকের বাসায় আমাদের নিয়ে গেলেন। ফিরোজ আলী তখন মধ্য বয়স্ক এক ব্যক্তি, তিনি একাত্তর সালে স্বপরিবারে মিরপুরে থাকতেন। একাত্তরের ২৫ মাচের্র পর তার ভাই পল্লবকে শুধু ‘জয় বাংলা’র অনুসারী হওয়ার অপরাধে কাদের মোল্লার নির্দেশে অবাঙ্গালি গুন্ডারা অকথ্য নির্যাতন করে নির্মম ভাবে হত্যা করে। তখন সমগ্র মিরপুরে হত্যা আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে কাদের মোল্লা ও তার অনুসারী অবাঙ্গালিরা । জবাই করে বাঙ্গালি হত্যা ছিল তাদের প্রতিদিনের রুটিনমাফিক কাজ। একেকটি জবাইর আগে ঘোষনা দিত যারা বাংলাদেশ তথা জয় বাংলা অনুসারী, তারা বিধর্মী-নাস্তিক-ভারতের দালাল, এদের হত্যা করা সওয়াবের কাজ! এমন জবাই’র নেশা বেড়ে যাওয়ায় কাদের মোল্লার নাম তখন এ তল্লাটে আতঙ্কের সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্থানীয়রা আব্দুল কাদের মোল্লাকে ‘কসাই কাদের’ নামকরণ করে । গরু জবাই এর মত মানুষ জবাই এ দক্ষতার নামডাকে(!) কসাই কাদের ‘মিরপুরের কসা‌ই’ নামেও পরিচিতি লাভ করে ব্যাপক ।

কসাই কাদের মোল্লার প্রতিহিংসার শিকার শহীদ পল্লবের ডাক নাম ছিল ‘টুনটুনি’। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বেশকিছু চলচিত্রে পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করে সুখ্যাতি অর্জন করে প্রতিপক্ষের চক্ষুশূল হন পল্লব। এ কথা জানান ফিরোজ আলীর স্ত্রী। পল্লব ছাড়াও কবি মেহেরুননেছা নামের এলাকায় খুবই শান্ত-নিরীহ প্রকৃতির বাঙ্গালী গৃহবধূ কসাই কাদের মোল্লার প্রতিহিংসার বলি হন। মিরপুর ৬ নং সেকশন, ডি ব্লক মুকুল ফৌজের মাঠের কাছাকাছি একটি বাড়িতে থাকতেন কবি মেহেরুননেছা। তিনি ছিলেন কবি কাজী রোজী’র ঘনিষ্ঠ বান্ধবী । কসাই কাদের মোল্লার নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে লেখালেখি’র অপরাধে মেহেরুননেছাসহ তার পুরো পরিবারকে বটি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছিল! এরপর টুকরো করা নরমাংস খন্ডগুলো নিয়ে ফুটবলও খেলা হয়েছিল ৬ নং মুকুল ফৌজ এর মাঠে! কসাই কাদের মোল্লার নির্দেশে ৩০/৩৫ জনের একটি অবাঙ্গালি ঘাতকের দল, মাথায় লাল ফিতা বেঁধে, ধারালো তলোয়ারে সজ্জ্বিত হয়ে অংশ নেয় কবি মেহেরুননেছা ও তার পরিবারকে হত্যাকান্ডে!

এ রকম আরও বেশকিছু তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে রাতে বাসায় ফিরেই লিখে ফেলি মিরপুরের কসাই কাদের মোল্লা ও তার অবাঙ্গালি দোসরদের একাত্তরের কালো অধ্যায়ের মূহূর্তগুলো । লেখা শেষ হতে হতে ভোর হয়ে যায় । সারা রাত ধরে আমার সোর্সরা নানাভাবে আরও সব তথ্য-উপাত্ত, বক্তব্য জোগাড় করে দেন। আর ভোরের দিকে এসে মাণিক ভাইও নিয়ে যান সে প্রতিবেদন। এরপর মাণিক ভাই’র নেতৃ্ত্বে আরও একটি দল এ ব্যাপারে আরও অনুসন্ধান চালিয়ে বের করে আনে কসাই কাদের মোল্লার সবিস্তার বৃত্তান্ত! এরপর এক পর্যায়ে এটি গণতদন্ত কমিশনের একটি রিপোর্ট হিসেবে ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বাষির্কীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের হাতে তুলে দেন জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের ৮টি রিপোর্ট!

যে রাতে মাণিক ভাই বাসায় এসেছিলেন সে রাতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা একাত্তরের ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার দ্ধারা ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য মানুষের স্বজনদের দেখা পাই যারা সবাই মিরপুরের বাসিন্দা । এরপর থেকে এমন ক্ষতিগ্রস্ত আরও অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হতে থাকে। ওই সময়ের বিরুপ রাজনৈতিক পরিবেশের কথা বিবেচনা করে আমরা তাদের অনেকের নাম ও বিবরণ তখন প্রকাশ করিনি। তবে সে ঘাটতি পরবর্তিতে পূরণ করেছেন মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রা‌ইবুনালের তদন্ত দল। তাদের অনুসন্ধান, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি ছিল তুলনামূলক অনেক সংগঠিত-বিজ্ঞানসম্মত ও আইনানুগ। তাদের দ্বারা সংগৃহিত তথ্য, উপাত্ত ও স্বাক্ষ্যে কসাই কাদের মোল্লার সার্বিক যুদ্ধাপরাধ বৃত্তান্ত উঠে আসায় এবং এর বিচার হওয়াতে একাত্তরে তার হাতে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মীরপুরবাসীর মনের ক্ষত কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে । আমার সেই তুখোড় যৌবনে এমন একটি কাজের সুযোগ করে দেয়া ফজলুল বারী ভাই, জুলফিকার আলি মাণিক ভাই তথা আমাদের সবার গুরু শাহরিয়ার কবির ভাই, আম্মা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কৃতজ্ঞতা।