যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের ইতিবৃত্ত

cover-kamaruআজ লিখবো আরেক শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ইতিহাস ও তার কর্মকাণ্ড নিয়ে। এই কামারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামির মতো ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সাথে সেই ১৯৭১ সাল থেকেই জড়িত ছিলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সম্পূর্ণ বিপক্ষে অবস্থান ছিলো তার। বিভিন্ন রকম মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড করেছিলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ময়মনসিংহে কামারুজ্জামানের দ্বারা ঘটানো ঘটনার কথা শুনলে এখনো শিহরিত হয় মানুষ। স্মৃতিপটে ভেসে উঠে ভয়ানক সেই চিত্র।

জামায়েত ইসলামের সাথে জড়িত ও রাজনিতীতে হাতেখড়ি সেই ছাত্রজীবন থেকেই। ১৯৬৭ সালে শেরপুর জিকেএম ইনস্টিটিউশনের দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় জামায়াতের তখনকার ছাত্র সংগঠন‍ ইসলামী ছাত্রসংঘের সমর্থক হিসেবে ছাত্র রাজনীতি শুরু। আশেক মাহমুদ ডিগ্রি কলেজে পড়ার সময় কলেজের হল শাখার ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি ছিলেন কামারুজ্জামান। তিনি কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সহকারী সাহিত্য সম্পাদক পদে নির্বাচন করেন।

১৯৭০ সালের শেষের দিকে কামারুজ্জামান কেন্দ্রের নির্দেশে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন ইসলামী ছাত্রসংঘের নিখিল পাকিস্তানের সভাপতি ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ প্রাদেশিক (পূর্ব পাকিস্তান) ইসলামী ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ যখন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন, তখন তিনি মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক অফিসের দফতর সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পণ করেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে ছিলেন মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল তিনিই প্রথম জামায়াতের কিলিং স্কোয়াড হিসেবে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলেন জামালপুরের আশেক মাহমুদ কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা একান্ত অনুগত নেতাকর্মীদের নিয়ে যার অন্যতম প্রধান সংগঠকও ছিলেন মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। মুক্তিবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের ছাড়াও কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, অধ্যাপক, সাংবাদিক, আইনজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পী, তথা বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য এ কিলিং স্কোয়াড গঠন করেন কামারুজ্জামান। এবং এই বাহিনী গঠনের এক মাসের মধ্যে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছাত্রসংঘের সব ক্যাডারকে এ কুখ্যাত বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি।

১৯৭১ সালের ১৬ মে পরীক্ষামূলকভাবে ৩১ বেলুচ রেজিমেন্টের তত্ত্বাবধানে ৭-১২ দিনের সশস্ত্র সামরিক ট্রেনিং দেন তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর, ময়মনসিংহ সদর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইল জেলার ৪৭ জন ছাত্রসংঘের কর্মীদের নিয়ে তৈরি করা আলবদর বাহিনীকে। ট্রেনিংয়ের সময় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করা, এগুলো খুলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া, বিস্ফোরক, মাইন অকেজো করা আর ওয়্যারলেস বার্তা বোঝার যোগ্যতা সৃষ্টি করা হতো। এ সময় তিনি আলবদরের বিভিন্ন মোজাহিদকে বারা বরগান, থ্রি নট থ্রি, লাইট মর্টার গান, এন্ট্রি এয়ার ক্রাফট গান, হ্যান্ড গ্রেনেড, মাইন্স এবং রিভলবারও সরবরাহ করেন পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে এনে।

সামরিক প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত এসব আলবদররা কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে ওই অঞ্চলসমূহে তথা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ সদরে হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং নিরস্ত্র সাধারণ বাঙালিদের অপহরণ, আটক, নির্যাতন, হত্যা, গণহত্যা ইত্যাদি অপরাধ সংঘটিত করতো। পাশাপাশি শহর-গ্রাম-গঞ্জে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি অপরাধকর্ম চালাতে থাকে। সেই এলাকাগুলোর বসবাসকারী তথা সেখানকার হিন্দু গোষ্ঠীকে দেশান্তরে বাধ্য করে।

এই আলবদর বাহিনীর মাধ্যমে স্বাধীনতাকর্মীদের খুঁজে বের করা, হিন্দুদের জোরপূর্বক মুসলমান বানানো, সেমিনার সিম্পোজিয়াম ও প্রচারপত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বিভিন্ন প্রপাগান্ডা প্রচার এবং প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্রভাবে মোকাবেলা করার কাজে নেতৃত্ব দেন এই কুখ্যাত কামারুজ্জামান।

পরে এই আলবদর বাহিনী সারাদেশে ছড়িয়ে যায় ও তাদের কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করে।  আলবদরের ডেপুটি চিফ অব কমান্ড হিসেবে নির্বাচিত হন মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ঠাণ্ডা মাথায় আলবদর বাহিনীর নৃশংসতা মুক্তিযুদ্ধের শেষ পাঁচটি মাসে জনমনে ভয়াবহ আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে নৃশংসতম ঘাতকে পরিণত হয় আলবদরেরা, যার সুপিরিয়র নেতৃত্ব ছিলো এই কামারুজ্জামানের।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলে অনেকগুলো রাজাকার-আলবদর ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প তৈরি করেন কামারুজ্জামান, যেখানে কামারুজ্জামানের নির্দেশে যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধ পরিচালনা করা হতো। কামারুজ্জামান ও তার সহযোগীরা কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে শেরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই সকল ক্যাম্পে নারী, পুরুষ, যুবক ধরে এনে তাদের ওপর নানা ভাবে অত্যাচার চালাতেন। কামারুজ্জামানের সহযোগীরা বন্দীদের চাবুক দিয়ে পেটাতেন। এই কামারুজ্জামান শেরপুর ডাকবাংলোয় বসেও মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সন্দেহভাজনসহ নিরীহ বাঙালিদের ধরে আনার নির্দেশ দিতেন এবং হত্যা, নির্যাতন চালাতেন।

সাতটি ক্যাম্পের মধ্যে সবচেয়ে নৃশংসতম ও সবচেয়ে বিভীষিকাময় ছিলো শেরপুর শহরের সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে অবস্থিত আলবদর ক্যাম্পটি। সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িটি অস্ত্রের মুখে দখল করে আলবদর বাহিনীর এ ক্যাম্পটি স্থাপন করেন কামারুজ্জামান। ক্যাম্পটির যাবতীয় তত্ত্বাবধানও করতেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। এই ক্যাম্পে অন্তত ৮০-৯০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছেন কামারুজ্জামান। দিনের পর দিন অন্ধকার কুঠুরিতে আটকে রাখা হতো লোকজনদের, চালানো হতো অমানুষিক নির্যাতন। এ সব নির্যাতন আর হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ সহযোগীতা করতেন আলবদর বাহিনীর জামালপুর মহাকুমার প্রধান আব্দুল বারী এবং অন্যতম সদস্য নাসির ও কামরান। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের টানা ৭ মাস সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে এই ক্যাম্পের ফটক রক্ষক হিসেবে কাজ করতেন আলবদর সদস্য মোহান মুন্সি।

বাংলাদেশ স্বাধীন আশরাফের সহযোগী আব্দুর বারীর একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি পাওয়া যায়। তাতে মুক্তিযোদ্ধাদের বন্দি ও হত্যা করা এবং হিন্দু নারীদের ধর্ষণের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এই আশরাফের সহযোগী ছিলেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। টর্চার ক্যাম্পে বন্দি গোলাম মোস্তফা তালুকদারকে গুলি করে হত্যা করা হয় কামারুজ্জামানের নির্দেশেই, তার সুস্পষ্ট প্রমাণও পাওয়া গেছে ওই ডায়েরিতে।

শেরপুরের ঝিনাইগাতির আহমেদনগরেও গঠন করা হয় টর্চার ক্যাম্প। সেখানে সব সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে তাদের গাড়ি করে ওই ক্যাম্পে যাতায়াত করতেন মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। আলবদর নেতা হিসেবে ওই এলাকায় পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতেন কামারুজ্জামান।

একাত্তর সালের জুন মাসের প্রথম দিকে শেরপুরের এমদাদুল হক হিরা মিয়া তার পরিবারের অন্য লোকজনসহ নিজ বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে গেলে সেখানেও কামারুজ্জামান গড়ে তুলেন আরও একটি পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্প। এ সময় অ্যাডভোকেট সামাদ, বিপ্লবী রবি নিয়োগীসহ অনেকের বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেন কামারুজ্জামান। ওই ক্যাম্পে এলাকার সাধারণ লোকজনদের ধরে এনে নির্যাতন ও হত্যা করে লাশ গণকবর দিতো কামারুজ্জামানের আলবদর বাহিনী।

জামালপুরের আশেক মাহমুদ কলেজ ছিল আলবদর বাহিনীর অন্যতম দফতর। জামালপুর মেডিকেল রোডেও ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও আলবদর বাহিনীর একটি দফতর। তাছাড়া কামারুজ্জামানের তত্ত্বাবধায়নে ময়মনসিংহ শহরের ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয়ও আলবদর বাহিনীর ক্যাম্প গড়ে উঠেছিলো। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরসহ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মূল হোতাও এই কামারুজ্জামান।

মুক্তিবাহিনীর সদস্য ও সমর্থকদের প্রতিহত এবং বিভ্রান্ত করতে স্বাধীন বাংলা চেকপোস্ট নামে একটি চেকপোস্ট খুলেছিলেন কামারুজ্জামান। ওই চেকপোস্টে মূলত ভারতগামী সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করা হতো। কখনো কখনো ওই চেকপোস্ট থেকে অনেককে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যাও করেন কামারুজ্জামান।

কামারুজ্জামান ও তার বাহিনী কিশোরগঞ্জ জেলার মুক্তিযোদ্ধা মোঃ হামিদুল হকের ওপর ও অমানুষিক নির্যাতন চালান। মোঃ হামিদুল হক ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকে মুজিব বাহিনীর একটি ট্রুপ নিয়ে ময়মনসিংহ শহরের নওমহলের বাসায় আশ্রয় নেন। মুক্তিযোদ্ধারা ওই বাসায় অবস্থান করছেন খবর পেয়ে কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে এ বাসা ঘেরাও করে। কামারুজ্জামান মোঃ হামিদুল হক ও অপর একজনকে গ্রেফতার করে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে আসে। সেখানে তাকে প্রতিনিয়ত পাকিস্তানের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হতো। সেই ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে কামারুজ্জামান মুক্তিযোদ্ধাদের, কাফের হিন্দুদের নির্বিচারে হত্যার আহ্বান জানানোর সংবাদটি তিনি শুনেছেন।

কামারুজ্জামানের নির্যাতনের স্বীকার হোন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা জিয়াউল হক ও। ১৯৭১ সালের ২২ আগস্ট বিকেল ৫টায় কামাড়িচরে তার নিজের বাড়ি থেকে গাজীর খামার যাওয়ার সময় ৩ আলবদর তাকে ধরে শেরপুর শহরে আলবদর টর্চার ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি কামারুজ্জামান ও তার সহযোগীদের দেখতে পান। জিয়াউল হককে তাঁরা টানা ২ দিন টর্চার ক্যাম্প এর “অন্ধকার কূপে” আটকে রাখে। তারপর তাকে শেরপুর ছেড়ে চলে যাওয়ার শর্ত দেয় অন্যথা হত্যা করার হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যক্ষ ড. সিরাজ উদ্দিনকেও কলেজ থেকে ধরে নিয়ে আসে তাদের ক্যাম্পে। এক পর্যায়ে তিনি মসজিদে মাগরিবের নামাজ চলাকালে কৌশলে পালিয়ে যান।

আলবদর প্রধান এই কামারুজ্জামান শেরপুর পৌরসভার সাবেক কমিশনার মজিদকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিল ওদের টর্চার ক্যাম্পে। পুরোটা দিন তাকে ওদের ক্যাম্পের অন্ধকার কূপে আটকে রাখা হয়।

১৯৭১ সালের নভেম্বরের শুরুতে কামারুজ্জামানের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোঃ জহুরুল হক মুন্সিকে শেরপুর এলাকা থেকে আটক করে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে স্থাপিত আলবদর ক্যাম্পে এনে নির্যাতন ও প্রহার করা হয়। সেখানে মেজর আইয়ুব ও কামারুজ্জামান তাকে নির্যাতন করেন। পরে সেই ক্যাম্প এর পাহারাদার আলবদর মোহন মুন্সি জহুরুল হককে ভিক্ষুক বলে শনাক্ত করলে কামারুজ্জামান তাকে ঘাড় ধরে লাথি মেরে আলবদর ক্যাম্প থেকে বের করে দেন। ক্যাম্প এ থাকাকালীন সময়ে জহুরুল হক ওই ক্যাম্প এ বন্দী বেশ কিছু লোকের চিৎকার ও আহাজারি শুনতে পান।

এই কুখ্যাত আলবদর প্রধান কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী সাধারণ মানুষের গরু, ছাগল ধরে নিয়ে আসতো। এবং পরিত্যক্ত সম্পত্তি জবরদখলও করে নিতো। মুক্তিযুদ্ধকালে বিভিন্ন সময়ে ডাকাতিরও অভিযোগ রয়েছে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে।

এই কামারুজ্জামান শেরপুরের সুর্যাস্তি গ্রামে গণহত্যা পরিচালনা করতে সহজগিতা করেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর।  নকলা মুক্তিযোদ্ধা হন্তার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করতেও সাহায্য করেন পাকিস্তানি সেনাদের।

আলবদর নেতা কামারুজ্জামানের সহযোগী ছিল মোঃ আশরাফ, আবদুল মান্নান, আবদুল বারী প্রমুখ। এদের প্রধান কাজ ছিল, ৩১ বেলুচ রেজিমেন্টের কমান্ডার সুলতান মাহমুদকে বাঙালি নিধনে সহযোগিতা করা। সুলতান মাহমুদের মনোরঞ্জনের জন্য নিরীহ বাঙালি নারীদের সরবরাহও ছিল কামারুজ্জামানের অন্যতম দায়িত্ব।

১৯৭১সালের ৭ ডিসেম্বর সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হেডকোয়ার্টার আহম্মেদনগর ক্যাম্প দখল করে শেরপুরকে আলবদর ও পাকিস্তানি বাহিনী মুক্ত করেন। তাঁরা কামারুজ্জামানের বাড়িতেও হামলা করেন। কিন্তু আগের রাতেই আহম্মেদনগর ক্যাম্পের পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে জামালপুরে পালিয়ে যান কামারুজ্জামান।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে পালিয়ে বেড়াতে থাকেন কামারুজ্জামান। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ করলে অন্যান্য সহযোগীর মতো কামারুজ্জামান নিজ এলাকা থেকে পালিয়ে সিলেটের দরগা মহল্লায় আত্মগোপন করেন।

স্বাধীনতার পর শহীদ বদিউজ্জামানের বড় ভাই হাসানুজ্জামান বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে নালিতাবড়ি থানায় । ওই মামলায় ১৮ জন আসামির মধ্যে কামারুজ্জামান অন্যতম। মামলাটির নম্বর-২(৫)৭২। জিআর নং-২৫০(২)৭২। তবে পলাতক থাকায় তখন কামারুজ্জামানকে আটক বা বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি।

১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের সুবাদে জামায়াতের সাবেক আমির নরঘাতক গোলাম আযম পাকিস্তানি পাসপোর্টে লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ফিরে এলে মতিউর রহমান নিজামী এবং অন্যান্যদের সাথে কামারুজ্জামানও প্রকাশ্যে বের হতে শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে জামায়াতের বর্তমান আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আহজারুল ইসলাম, কাদের মোল্লা, মীর কাসেম আলী ও আবু তাহেরের নেতৃত্বে ঢাকার ইডেন হোটেলে ইসলামী ছাত্রসংঘ নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ছাত্রশিবির। ছাত্রশিবিরের প্রথম কমিটির সভাপতি ছিলেন মীর কাসেম আলী। আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কামারুজ্জামান। পরে কামারুজ্জামান ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে শিবিরের রগকাটা রাজনীতির সংস্কৃতির প্রবর্তকও এই কুখ্যাত ঘাতক কামারুজ্জামান। এক পর্যায়ে কামারুজ্জামান জামায়াতের মুখপাত্র, সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদক ও দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এ সূত্রে তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদ ও রাজধানীর মিরপুর সাংবাদিক আবাসিক এলাকায় প্লট বাগিয়ে নেন।

শেরপুরের সাধারণ জনতা কামারুজ্জামানকে এখনও আলবদর কমান্ডার হিসেবেই চিনে এবং “নরঘাতক” ,“কুখ্যাত” বলেই সম্বোধন করে থাকেন। এবং এ কারনেই বারবার নিরবাচনে প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করার পরও কখনো নির্বাচিত হতে পারেনি এই কুখ্যাত ঘাতক কামারুজ্জামান।

শুধু হত্যাই করেননি কামারুজ্জামান, বরং পরিচালনা করেছেন বিভিন্ন লুট ও ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধও। জোর জবরদস্তী করে অসংখ্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিলেন কামারুজ্জামান। এই কুখ্যাত দেশদ্রোহী আলবদর নেতা কামারুজ্জামানের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে এই আশাই ব্যক্ত করছি। আসুন সবাই একসাথে শাহবাগ আন্দোলনের শ্লোগানটি আবারো বলিঃ “ক-তে কাদের মোল্লা, তুই রাজাকার তুই রাজাকার, ন-তে নিজামি, তুই রাজাকার তুই রাজাকার, গ-তে গোলাম আযম, তুই রাজাকার তুই রাজাকার”।