যুদ্ধাপরাধের প্রথম ফাঁসি কসাই কাদেরের ফাঁসি

ফাঁশির মঞ্চে যাবার আগে বার বার কাদের মোল্লা জানতে চেয়েছিল যে জাতিসংঘ থেকে কি কোন চিঠি আসে নি? কসাই কাদেরের ভরসা ছিল জাতিসংঘ ও দুই একটা পসছিমা দেশ গুলো থেকে চিঠি এসে তার ফাঁশিতে ঝুলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ভণ্ডুল করে দেবে। এই তথ্য কারাগারের ভিতর থেকে একাধিক দায়িত্বশীল ব্যাক্তিদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি।

১০ ও ১২ ডিসেম্বর কসাই কাদেরের সাথে সাক্ষাতে আশা ইসলামী নেতাদের বার বার ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায়, হর কারবালা কি বাদ, এগুলো আবৃতি করে শুনায়। ইসলামের কথা বলে মমানুষদের ভ্রমিত করেছে  আর যত বার যুদ্ধাপরাধের কথা মানবতা বিরোধী অপরাধের কথা জানতে চাওয়া হয়েছে ততবার গলা কাতা মুরগির মতো ছটফট করেছেন আদালতে। অপরাধ চাপা থাকে না কোনদিন। অপরাধীর অপরাধ সামনে আসলেই বারংবার কসাই কাদেরকে ভয়ে মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যেতে দেখেছে সবাই।ভেবেছিলেন টাকার গরমে ফাঁশির হাত থেকে বেঁচে যাবেন কিন্তু যখন ই বিচারের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে তখন থেকে ফাঁসি হবার আগ পর্যন্ত ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে গিয়েছিল কসাই কাদের।

কসাই কাদের ফাঁসি নিয়ে প্রথমে কিছুটা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় কারা কর্মকর্তাদের। ১০ ডিসেম্বর থেকে ফাঁসি কার্যকর হবার গুঞ্জন শুরু হয়। ১১ ডিসেম্বর বুধবার সকালে, কারা কর্তৃপক্ষের কাছে কাদের মোল্লার পক্ষের আইনজীবীরা সবুজ কাগজে হাতে লেখা আবেদনের ওপর বিচারপতির লিখিত নির্দেশ নিয়ে হাজির হন। এতে কোনো সিল ছিল না। সর্বোচ্চ আদালতের প্যাডও ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু বৃহস্পতিবার কারা কর্তৃপক্ষ উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করেন এবং সেখান থেকে খবর আসে যে আদালতের রায়ের সিদ্ধান্ত অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এর কথা জানানো হয়। কাদের মোল্লা ছিলেন ৮ নম্বর সেলে সেখান থেকে ফাঁশির মঞ্ছের দূরত্ব আনুমানিক ২০ গজ। বৃহস্পতিবার রাতে ৯ তা ১৫ মিনিটের মধ্যেই ফাঁশির সব আয়োজন সম্পন্ন হয়। কারা কর্তৃপক্ষ নিয়ম মতই কসাই কাদের কে  ফাঁশি কার্যকরের কথা জানিয়ে রায়ের খসড়া পড়ে শোনান। কাদের মোল্লা অথোরিটি কে বলে, আমার আইনজীবীরা আসবেন। তাদের সঙ্গে কথা শেষ হয়নি। এই কথার পর  কারা কর্তৃপক্ষ কাদের মোল্লাকে তার শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চান। ওই মুহূর্তেই কসাই কাদের জানতে পারে যে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছে। নিচু স্বরে বলে, মায়ের পাশেই যেন তাকে কবর দেয়া হয়। ৯ টা ২৫ এ তওবা পরানোর জন্য কাদের মোল্লার কাছে মসজিদের ইমামকে পাঠানো হলে, কসাই কাদের বলেছিল, যে তার কোন মাওলানা লাগবে না। বলেছিল, আমি নিজেই তওবা পড়তে পারবো। তার পর মাওলানা ইমাম উনি তওবা পাঠের বিষয়টি উপস্থাপন করলেও কসাই কাদের নিজেই তওবা পাঠ করে। ৯ টা ৫৫ মিনিটে প্রধান জল্লাদ শাজাহান সহ্য ৪ জল্লাদ নিয়ে এক কারা কর্মকর্তা কসাই কাদেরের কনডেম সেল এ গিয়ে এই নরঘাতক কে যম টুপি পরায়। এই সময় নির্বিকার অবস্থায় ছিল কসাই কাদের। ঠিক ৯ টা ৫৯ মিনিট ৩০ সেকেন্ড সময়ে ১৯৭১ এর নরঘাতক কসাই কাদেরকে ফাঁশির মঞ্চের দিকে আনা হয়। এসময় কাদেরের মুখে ছিল ইতস্তত বোধ। ১০ টায় তোলা হয় ফাঁশির মঞ্চে, গলায় পরানো হয় ফাঁশির রশি।  কাদের ছিল কয়েদির পোশাক পরে, মাথায় ছিল যম টুপি, পা ছিল খালি। জল্লাদ শাহজাহান কসাই কাদের কে উদ্দেশ্য করে বলে, দুই পা একসঙ্গে করেন। কাদের মোল্লা তখনই বলে, জেল সুপার আছেন? ঠিক ১০ টা ১ মিনিটে কারা সুপার রীতি অনুযায়ী লাল রুমালটা মাটিতে ফেললেন। আর রুমালটা মাটিতে পরার সাথে সাথেই ফাঁশির মঞ্চের হাতলটা পেছনের দিকে টান দেন জাল্লাদ। সঙ্গে সঙ্গে কসাই কাদেরের পায়ের নিছ থেকে কাথের পাটাতনটি সরে যায়। এভাবেই নরঘাতক কাদের মোল্লা ওরফে কসাই কাদেরের ফাঁসি কার্যকর হয়ে যায়।

১১ ডিসেম্বর ২০১৩ ইতিহাসের দায়মুক্তির দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির কাছে। শাহাবাগ আন্দোলনের যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবির প্রথম ফাঁসি হয়ে গেল। আজ ঋণমুক্তির দিন। বিজয়ের দিন। আনন্দের অশ্রু চোখে অবিরাম কান্নার দিন। ন্যায় প্রতিষ্ঠার দিন। জাতি আজ কলঙ্ক মোচনের একটি ধাপ অতিক্রম করল। জয় বাংলা।