নিজামীর আদ্যোপান্ত

আমাদের দেশের আরেকটি শীর্ষ রাজারের নাম, মতিউর রহমান নিজামী। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দলনেতা বা আমীর হিসেবে বাংলাদেশে রাজনীতি করে আসছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই নিজামীর অবস্থান ছিলো পুরোপুরি স্বাধীনতা বিরোধী। নিজামী কখনো চান নি বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হোক, কখনো চান নি এদেশের মানুষ উন্নতি করুক। তাই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই সময়কার আধা-সামরিক বাহিনী আলবদরের। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অথবা মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত হাজার হাজার বাঙ্গালীকে হত্যা করেছে এই নরপশু। নিজামী উপাধিটিও কিন্তু তার নিজের দেওয়া। নিজের নামকে আরও সম্মানিত করতে এবং নিচু বংশের পরিচয় লুকাতেই মুলত নিজামী উপাধি গ্রহণ করেন মতিউর রহমান। তবে তার গ্রামের লোকেরা তাকে এতই ঘৃণা করতো যে, নিজের দেশের মানুষের প্রতি নির্লজ্জ বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তারা তাকে এখনও মইত্যা দালাল বা মইত্যা রাজাকার বলেই ডাকে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় নানান ধরনের স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন মতিউর। তৎকালীন জামায়াতের যুব ফ্রন্ট ইসলামী ছাত্র সংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্র শিবির) এর প্রেসিডেন্ট ছিল মতিউর। মতিউরের সরাসরি তত্ত্বাবধায়নে গঠিত হয় আলবদর বাহিনী, মতিউর ছিলেন আলবদরের সর্বাধিনায়ক। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থকদের হত্যা করা ও ইসলামের অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। তারা ধর্মনিরপেক্ষ বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবিদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরী করতো এবং তাদেরকে এক এক করে নিশ্চিহ্ন করে দিতো।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় মতিউর রহমান জামাতের অন্যতম আদর্শিক নেতা হিসেবে তার দলের সমর্থকদের সংবাদপত্রে প্রবন্ধ এবং জনসভায় ভাষণের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের হত্যায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সমর্থনে প্ররোচিত করতো। জামায়াতের মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রামের একটি সংখ্যায় এই মইত্যা রাজাকার লিখেছিলো, “সেইদিন বেশী দূরে নয় আল-বদরের তরুনরা সশ্রস্ত বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে হিন্দু শক্তিকে পরাজিত করবে এবং ভারত ধ্বংসের পর ইসলামের বিজয় পতাকা সারাবিশ্বে উত্তোলন করবে।” সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, নভেম্বর ১৪, ১৯৭১

১৯৭১ সালের ১২ই এপ্রিল পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের জন্য গোলাম আযম এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় সহযোগী, যেমন সবুর খানের সাথে এই মইত্যা রাজাকার ঢাকায় একটি মিছিলে নেতৃত্ব দেয়। শান্তি কমিটির ব্যানারে এই মিছিল পাকিস্তানের বিজয়ের জন্য বিশেষ প্রার্থনার মাধ্যমে শেষ হয়। সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, এপ্রিল ১৩, ১৯৭১

সীমান্ত শহর যশোরে রাজাকার বাহিনীর জেলা সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয় বেসামরিক বাহিনীর একটি সভা। সেই সভায় ভাষণ দেয় মতিউর রহমান, এবং  সেই ভাষণে বলে, “জাতীয় সংকটের এই মুহুর্তে যারা পাকিস্তান এবং ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত, তাদের সকলকে নিশ্চিহ্ন করার জাতীয় দায়িত্ব পালন করা প্রত্যেক রাজাকারের কর্তব্য।” সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, সেপ্টেম্বর ১৫, ১৯৭১

নিজ জেলা পাবনাতে মতিউর রহমান চালায় নানা ধরনের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড। তার মধ্যে ছিলো হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, অবৈধভাবে জমি দখল করা, লুটপাট ইত্যাদি। মতিউর সম্পর্কে বেড়া থানার ব্রিশ্লিকা গ্রামের আমিনুল ইসলাম ডাবলু বলেন, তার বাবাকে মতিউরের আদেশে হত্যা করা হয়, ঐ এলাকার আরও লোকদেরকে মতিউরের নির্দেশে হত্যা করে আলবদর বাহিনী। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, প্রফুল্ল প্রামাণিক, ভাদু প্রামাণিক, মানু প্রামাণিক এবং শষ্ঠি প্রামাণিক। ডাবলু বলেন, ঐসব হত্যাকান্ডের বহু প্রত্যক্ষদর্শী ছিল।

পাবনার মাধবপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস এক অসম যুদ্ধে গ্রেফতার হোন আলবদর বাহিনীর কাছে। গ্রেফতারের পর তাঁকে আল-বদরের নির্যাতন কক্ষে দুই সপ্তাহ আটকে রাখা হয়। কুদ্দুস বলেন, মুক্তিযোদ্ধা এবং যুদ্ধের স্থানীয় সমর্থকদের হত্যার ব্যাপারে মতিউরের তত্ত্বাবধানে আল-বদর বাহিনীর পরিকল্পনার কথা তিনি শুনেছেন।

২৬শে নভেম্বর রাজাকার কমান্ডার সাত্তার মতিউরের আদেশে পাকিস্তানী বাহিনীকে ধুলাউপাড়া গ্রামে নিয়ে যায়। এবং সেখানে ৩০জন মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের হত্যা করা হয়। কুদ্দুস কমিশনকে বলেন যে তিনি আল-বদর বাহিনীর একটি গোপন বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন যেখানে মতিউর রহমান সভাপতিত্ব করে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার নির্দেশ দেয়। তাছাড়া ঐ সভায় আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘর এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি তালিকাবদ্ধ করে। মতিউর আওয়মী লীগ সমর্থকদের ঘাঁটি নিশ্চিহ্ন করতে কঠোর নির্দেশ দেয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহারকৃত সম্ভাব্য ঘাঁটি এবং নিরাপদ ঘরবাড়িগুলো চিহ্নিত করা হয়। কুদ্দুস আরও বলেন, মতিউর আওয়ামীলীগ সমর্থকদের নিশ্চিহ্ন করতে আদেশ দেয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়। ঐ সভার পরদিন, আল-বদর বাহিনী রাজাকারদের সহায়তায় ব্রিশ্লিকা গ্রাম ঘিরে ফেলে এবং জ্বালিয়ে দেয়। তিনি আরো বলেন, মতিউর নিজে সাথিয়া থানার মাধবপুর গ্রামের বাতেশ্বর সাহাকে বেয়নেট দিয়ে হত্যা করে।

মতিউর রহমান নেতৃত্ব দেয় পাবনায় লতিফ নামে ১৯ বছর বয়সী একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং তার দলকে হত্যাযজ্ঞে। লতিফ তখন পড়াশোনা করতেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের প্রথম বর্ষে। ধুলিউড়িতে একটি অসম যুদ্ধে লতিফের ছোট দলটিকে আটক করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদেরকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য মতিউরের বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। মতিউরের আদেশে তার সৈন্যরা কুরবানির সময় গরু জবাই দেওয়ার ছুরি দিয়ে লতিফের সহযোদ্ধাদের জনসমক্ষে ছুরি দিয়ে জবাই করে। পরে তারা এক এক করে লতিফের চোখ উপড়ে ফেলে, যৌনাঙ্গ কর্তন করে এবং সবশেষে তার মৃতদেহ একটি গাছের ডালের সাথে বেঁধে রাখে। লতিফের বাবা সুফিয়ান প্রামাণিক তার সন্তানের নির্মম হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।

মতিউরের বাহিনী আটক করেছিলো লতিফের ভাই শাহজাহান আলীকেও। তিনিও মাধবপুর গ্রামের একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাকেও নরপিশাচরা জবাই করার চেষ্টা করেছিলো। এক পর্যায়ে তাঁকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে যায়। কিন্তু শাহজাহান সর্বান্তকরণে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, আলবদরের ছুরি তাঁর প্রাণ নিতে পারেনি। মারাত্নকভাবে আহত অবস্থায় শাহজাহান জীবন বাঁচিয়ে পালাতে সক্ষম হন। মতিউরের ছুরি শাহজাহানের জীবন নিতে পারেনি, কিন্তু তাঁর কন্ঠস্বর কেড়ে নিয়েছিল। শাহজাহান আর কখনো কথা বলতে পারেননি।

মতিউর এবং তার আল-বদর বাহিনীর হাতে যারা নিহত হয়েছিলেনঃ

মোঃ সোহরাব আলী,প্রফুল্ল প্রামাণিক,ভাদু প্রামাণিক, মনু প্রামাণিক, শষ্ঠি প্রামাণিক, বাতেশ্বর সাহা, মুক্তিযোদ্ধা লতিফ, লতিফের দলের ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা, দারা, চাঁদ, মুসলেম, আখতার, কবির।

১৯৭১ সালে মতিউর ব্যক্তিগতভাবে শত শত হিন্দুদের হত্যা করে এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে।  যুদ্ধের নয় মাসের মধ্যে অবস্থাপন্ন হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে অর্থ, অলংকার এবং অন্যান্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে কোটিপতি হয়ে যায় মতিউর।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে লুকিয়েছিলো এই নরঘাতক মতিউর রহমান।  তবে ১৯৭৬ সালে স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি জিয়ার রাজাকার পূনর্বাসন কর্মসূচীর আওতায় মতিউর পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসে।  এবং পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে রাজনীতি করে।

স্বাভাবিকভাবেই জামায়াতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি শুরু করে ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।  আর জামায়াতের এই ঢালের পেছনেই নিজের অপরাধ সমূহ আড়াল করার চেষ্টা করে এই মতিউর রহমান ওরফে মইত্যা রাজাকার। জামায়াতে সংশ্লিষ্ট রাজনীতির অংশ হিসাবে মতিউর বাংলাদেশে ইসলামী মতাদর্শ প্রতিষ্টায় সচেষ্ট হয়।

১৯৭৬ সাল থেকে তথাকথিত জেনারেল জিয়ার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সৌদী আরব, ইরান, লিবিয়ার মত ইসলামিক দেশের আর্থিক সাহায্যে মতিউর এবং তার সহচররা  কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে দেশব্যাপী ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।  জামাতে ইসলামীর আধ্যাত্নিক নেতা মওদুদীর মতবাদ অনুসারে পরিচালিত এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচী এবং পাঠ্যক্রম।  এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয় কারণ তাদের শিক্ষাপদ্ধতি ছাত্রদেরকে সনাতন আরবী সাহিত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।  আর এভাবেই দেশের আনাচে কানাচে সৃষ্টি হয়ে জামায়াতের ধর্মীয় শিক্ষার নামে ব্রেইন ওয়াশ-এর কার্যক্রম।

তবে শুধু ধর্মভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেই ক্ষান্ত থাকেনি এই মতিউর রহমান।  দেশের পরবর্তী প্রজন্মকে বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়া করার জন্য ঢাকা শহরের সবচেয়ে অভিজাত এলাকায় প্রতিষ্ঠা করে একটি ইংরেজী মাধ্যমের কলেজঃ “মানারাত ইন্টারন্যাশনাল কলেজ”। কলেজটির নামে ইন্টারন্যাশনাল নাম দিয়ে তাদের আন্তর্জাতিক মান আছে বলে দম্ভোক্তি করে।  বাংলাদেশের অবস্থাসম্পন্ন মুসলমান পরিবারের সন্তানরা এই কলেজে ভর্তি হওয়া শুরু করে।  মানারাত একটি ইংরেজী মাধ্যমের কলেজ সেই যুক্তিতে যে তারা জ্ঞানদান করে ইংরেজী ভাষায়। কিন্তু এর পাঠ্যসূচীতে কি আছে? কোরআন এবং মধ্যযুগীয় সকল আরবী ধ্যানধারনা। মানারাত কলেজ থেকে পাশ করা ছাত্ররা বাহ্যিক দৃষ্টিতে স্মার্ট হলেও বুদ্ধিবৃত্তিক ও আচরণের দিক দিয়ে মধ্যযুগীয়।  রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গোলাম আযম এবং মইনুদ্দীনরা ভয়ংকর পিশাচ হলেও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মতিউর এবং সাঈদীরা আরো বেশী উগ্র এবং সমাজে তাদের প্রভাব ব্যাপক।

শুধু তাই নয়, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর নিজামীর নিজস্ব সশস্ত্র সন্ত্রাস বাহিনী তার সংসদীয় এলাকার একটি অংশ হালদার পারায় প্রায় ২০টি হিন্দু পরিবারকে জোরপূর্বক গরুর মাংস খেতে বাধ্য করে।  এরকম আছে আরো শত শত অপরাধের তালিকা যা সব লিখতে গেলে হয়তো একটি বই লিখে ফেলা যাবে।