সমকামিতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি

বাংলাদেশে সমকামিরা সবসময়ই সমাজের একটি নিগৃহীত অংশ হিসেবেই পরিচিত।  তাঁরা নানা সময় স্বীকার হয় নানা ধরনের বৈষম্যের। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা একেবারে নেই বললেই চলে। এমনকি কেউ কেউ তাদের অস্তিত্ব বাংলাদেশে আছে তাও স্বীকার করেন না। বাংলাদেশ গুটিকয়েকটি দেশের অন্যতম যেখানে রাষ্ট্র শুধু সমলিঙ্গের মানুষদের মধ্যেকার যৌন সম্পর্কের অস্তিত্ব অস্বীকারই করে না, বরং একে শাস্তিযোগ্য বিষয় বলে মনে করে।

আসুন দেখে নিই বিভিন্ন ধর্ম সমকামিতা নিয়ে কি বলেঃ

ইসলাম ধর্মে সমকামিতাঃ ইসলামে সমলিঙ্গীয় যেকোনো ধরনের যৌনতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কুরআন ও হাদীসে পূর্ববর্তী ইব্রাহিমীয় ধর্মের মতই কওমে লুতের সমকামিতা ও পুংমৈথুনের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। কোরানে সমকামীদের ‘লুতের লোক’ বলা হয়েছে, নবী লুতের ঘটনাকে ভিত্তি করে। সমকামিতা ত্যাগ না করার চূড়ান্ত পরিণতিতে শাস্তি হিসেবে ঐশী বিপর্যয়ের মাধ্যমে তাদের ধ্বংস হওয়ার কথাও উঠে এসেছে। এছাড়া হাদীসে সডোমি অর্থাৎ পুংমৈথুনকারী বা পুংপায়ুকামী ও সমকামী ব্যক্তিদেরকে হত্যা করার নির্দেশ এসেছে। নবী মুহম্মদ সমকামিতার শাস্তি নির্ধারন করে গেছেন মৃত্যুদন্ড। (আবু দাউদ ৩৮:৪৪৪৭, তিরমিযি ১:১৫২)। মোহাম্মদের পরে খলিফাদের সময়ে আবু বকর ও উমর কিছু সমকামিকে জীবন্ত দগ্ধ করেছিলেন বলেও জানা যায়।

ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগে মুসলিম দেশগুলো সহ সারাপৃথিবীজুড়ে যেসব নাফরমানী শুরু হবে, তার মধ্যে একটি হল এই সমকামিতা। ধর্মগ্রন্থ আল কোরানের বিভিন্ন সুরা-আয়াতে মানুষের সমকামি-প্রবনতার বিরুদ্ধে বিচিত্র সব শাস্তি এবং গজবের কথা বলা আছে। পাথরবৃষ্টি, ভুমিকম্প, বন্যা ইত্যাদি দিয়ে আল্লাহ তাৎক্ষনিক ভাবে সমকামীদের মাটিতে পিশে শায়েস্তা করেন, (সুরা ৭:৮০-৮২, ২৬:১৭৩, ২৯:২৮-২৯)।

তবে, মানুষের সমকামিতাকে বৈধতা দানকারী টপ-লিস্টেড চিহ্নিত রাষ্ট্র নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, বেজিয়াম, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সহ কোন দেশেই পাথর বৃষ্টি বা অনুরুপ কোন শাস্তি কেন আল্লাহার পক্ষে শুরু করা এখনো সম্ভব হয় নি তা ইসলামিক গবেষণার বিষয় হতে পারে।

হিন্দু ধর্মে সমকামিতাঃ হিন্দু ধর্মের গ্রন্থ গুলোতেও সমকামিতার জন্য কিছু অদ্ভুত শাস্তির বিধান রয়েছে। আবার শাস্তির বিচারের ক্ষেত্রে দেখা যায় মেয়ে-মেয়ে সমকামিতার শাস্তি পুরুষ-পুরুষ সমকামিতার শাস্তির থেকে বেশী। মনুসংহিতার আইনে উল্লেখ আছে – ‘যদি কোন বয়স্কা নারী অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীর (কুমারীর) সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে বয়স্কা নারীর মস্তক মুণ্ডন করে দুটি আঙ্গুল কেটে গাধার পিঠে চড়িয়ে ঘোরানো হবে’ (Manu Smriti chapter 8, verse 370.)।

যদি দুই কুমারীর মধ্যে সমকামিতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাহলে তাদের শাস্তি ছিলো দুইশত মূদ্রা জরিমানা এবং দশটি বেত্রাঘাত (Manu Smriti chapter 8, verse 369.)। সে তুলনায় পুরুষদের মধ্যে সম্পর্কের শাস্তি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বলা হয়েছে – দু’জন পুরুষ অপ্রকৃতিক কার্যে প্রবৃত্ত হলে তাদেরকে জাতিচ্যুত করা হবে (Manu Smriti Chapter 11, Verse 68.) এবং জামা পরে তাকে জলে ডুব দিতে হবে (Manu Smriti Chapter 11, Verse 175.)।

কিন্তু বিজ্ঞানের আলোকে দেখতে গেলে মানুষের যৌনপ্রবৃত্তির ওপর নির্ভর করে মানুষকে মোট ৩ ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমে জেনে নেই, যৌনপ্রবৃত্তি কি? যৌনপ্রবৃত্তি বলতে বোঝায় পুরুষ, নারী বা উভয়লিঙ্গের প্রতি পারস্পরিক আবেগ, প্রণয় অথবা যৌন আকর্ষণ জনিত এক স্থায়ী সম্পর্কাবস্থা। যৌনপ্রবৃত্তির ওপর নির্ভর করে মানুষকে যে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়, তা হলোঃ বিপরীতকামিতা (বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ), সমকামিতা (সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ) এবং উভকামিতা (উভয় লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ)।

সমকামী যৌন আচরণকে অপ্রাকৃতিক মনে হলেও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা জায় যে, সমকামিতা মানব যৌনতার একটি সাধারন ও প্রাকৃতিক প্রকার মাত্র, এবং অন্য কোন প্রভাবকের অস্তিত্ব ছাড়া এটি মনের উপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। যেহেতু এটি প্রমানিত যে, সমকামিতা কোন অপ্রাকৃতিক কোন বিষয় নয় বরং প্রকৃতিরই একটি অংশ, সেহেতু ধর্মীয় গোঁড়ামি মেনে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান করাটাও অযৌক্তিক।

স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের দেশের মানুষ ধর্মীয় গোড়া মনমানসিকতা পোষণ করে থাকেন। তাঁরা কখনোই সমকামিতাকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেন নি। সমকামিতা নিয়ে মানুষের সচেতনতা বলতে গেলে শুন্যের কোঠাতেই আছে। আর এখনো অনেকেই ধর্মের দোহাই দিয়ে সমকামিদের অস্তিত্ব ও অধিকার অস্বীকার করেন এবং অন্যকেও করতে বাধ্য করেন।  তবে আশার বিষয় হচ্ছে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে সমকামি পুরুষের অধিকার আন্দোলনটি বেশ অনেক এগিয়েছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, তারাও আমাদের মতো রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। তারাও শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে ঠিক আমাদেরই মতো। কিন্তু পার্থক্য একটাই, আমাদের থেকে ভিন্ন যৌনপ্রবৃত্তি। বিজ্ঞানীরা বলেন জিন গত, হরমোনগত কিংবা পরিবেশগত কারনে একজন মানুষ যৌন অভিমুখী হয়ে থাকেন।

বাংলাদেশে এলজিবিটি কমিউনিটির সদস্যদের, আমাদের মতো মৌলিক নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার আইনের পরিবর্তনের দাবি জানাই। সরকার থেকে পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত আসলে আমরা সাধারণ জনগণের কাছ থেকে বিশেষ কিছু আশা করতে পারিনা।

সমকামিতা ও এলজিবিটি নিয়ে নানা ধরনের সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রকাশিত হলো ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন “রূপবান”-এর দ্বিতীয় প্রকাশনী। এই ম্যাগাজিনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে একঝাক সমকামি তরুন। তাদের সবাইকে সাধুবাদ জানাই, ও আমার পক্ষ থেকে যেকোনো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি, আশা করি, আপনারাও সহযোগিতার হাত বাড়াবেন, নিজের অবস্থান থেকেই। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের আইন এবং প্রধান দুটি ধর্ম ইসলাম ও হিন্দু ধর্মে ভয়াবহ ঘৃণা এবং শাস্তির জন্য সমকামীরা নিজেদেরকে কখনোই প্রকাশ করার কথা চিন্তাও করতে পারে না। এই রকম পরিবেশে রূপবানের মতো একটি সমকামী ম্যাগাজিন বাংলাদেশে প্রকাশ আসলেই সাহসী উদ্যোগ। সাহসী উদ্যোগের প্রশংসা না করে পারলাম না। সবাইকে ম্যাগাজিনটি পড়ার/সংগ্রহ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।