শেখ মুজিব ও অস্তিত্ব

৭ মার্চ ১৯৭১। সেই ঐতিহাসিক দিনে জাতির জনকের ঐতিহাসিক ভাষণ যা এখনো প্রতিধ্বনিত হয়, “এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম”। দু চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে বঙ্গবন্ধু সেই এক হাত উঁচু করে অবলীলায় বলে চলেছেন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার কথা। মাথা নত না করে বাঁচার মত বাঁচতে। প্রতিবাদী হয়ে দেশ স্বাধীন এর কথা। একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখার কথা। এই বাংলাদেশের কথা। তার চোখে দেখা এক টুকরো সোনার দেশের কথা। এই জন্মভুমির কথা। সেই দিন ঠিক কি হয়েছিল? কেমন করে জনসমুদ্রের ঢল নেমেছিল রেসকোর্স ময়দানে? কেন জড় হয়েছিল ৭ লক্ষ মানুষ? কিসের টানে?

অনেকেই এরকম প্রশ্ন করে প্রায়। বঙ্গবন্ধুর কি এমন ক্ষমতা ছিল যে ওই সময়ে বাংলার প্রায় সব মানুষ এর মন জয় করে নিয়েছিলেন? কেন শুধু মাত্র কিছু ভাষণ আর কথার ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার মানুষ এক হয়ে স্বাধীনতার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল? ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে এক জোট হয়ে মানুষ দেশ স্বাধীনের লড়াইয়ে লড়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে?

এরকম হাজারো প্রশ্ন প্রায়শ করে বসে অনেকেই। আমিও চেষ্টা করে ঠিক ঠাক ভাবে উত্তর দিতে। অনেকেই খুশি হন আবার অনেকেই আওয়ামী পন্থী বলে গালি দিয়ে চলে যান। একটা বিষয় এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাপার টা পরিষ্কার করে বলা দরকার। জাতির জনক কথাটির সম্পূর্ণ মানে বুঝতে হবে আমাদের। এই সম্বোধন এর তাৎপর্য বুঝতে হবে। যিনি একটি জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, দিয়েছেন মান, মাথা উঁচু করে যিনি বাঁচতে শিখিয়েছেন, ন্যায্য অধিকার পেতে যিনি লড়াই করতে শিখিয়েছেন, দিয়েছেন সম্মান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে প্রতিবাদ করতে যিনি শিখিয়েছেন, যার স্বাধীনতা ঘোষণায় সাড়া দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাগণ যুদ্ধে নেমেছিলেন আর দিয়েছেন আমাদের একটুকরো দেশ, লাল আর সবুজের পতাকা, ইনি হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।

জাতির পিতা স্বয়ং, কোন রাজনৈতিক দল এর সম্পত্তি নয় যে ট্রেড মার্ক করে, থাপ্পা বসিয়ে কোন রাজনৈতিক দল ওনাকে কিনে নিয়েছে। উনি হলেন বাংলাদেশের বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। জাতির জনক একজনই। যিনি সমস্ত বাংলাদেশীর জাতির পিতা। ওনার জন্যই আজকে আমরা একটি স্বাধীন দেশে, বাংলাদেশ নামে সারা পৃথিবীতে মাথা তুলে বেঁচে আছি। জাতির জনক সম্পর্কীয় কোন কথা বললে কেউ আওয়ামীলীগ পন্থী হয়ে যায় না। সবার জাতির পিতা হতে পারার মত যোগ্যতা থাকে না।

বাংলাদেশে অনেক মানুষ আছে যারা কোন রাজনৈতিক দল করেন না কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শে বিশ্বাসী। জাতির জনক কে মন প্রান দিয়ে ভালবাসেন। আমিও ঠিক এই দলের একজন সদস্য। বঙ্গবন্ধু তৎকালীন সময়ে একটি স্বাধীন দেশ পাওয়ার গুরুত্ব খুব ভাল করেই টের পেয়েছিলেন।বুঝতে পেরেছিলেন আগামীর ঘোর অনর্থ আর অশনিসংকেত এর কথা। উনি বুঝতে পেরেছিলেন পূর্ব বাংলার মানুষদের সামনের দিকে ধেয়ে আসা দুর্দশার কথা। সারাজীবন পাকিস্তানীদের পায়ের নিয়ে পিষ্ট হয়ে ধুকে ধুকে বাঁচার মত অসহনীয় মৃত্যুযন্ত্রণার দৃশ্য বহু আগেই দেখতে পেয়েছিলেন। তাই আজকে যারাই জাতির পিতার এই অনস্বীকার্য অবদানকে অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলে, তারাই হল রাষ্ট্রদ্রোহী। বাংলার মাটিতে রাজাকার আর এই সব রাষ্ট্রদ্রোহী দের ঠাই কোন দিন ও হবে না। দেশ কে বিক্রি করে দেয়ার জন্য স্বাধীনতা আসে নি। দেশ কে পাকিস্তানি করার জন্য বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। ৩০ লক্ষাধিক মানুষ শহীদ হয়েছেন স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর বিতর্কিত হবার জন্য নয়। দেশকে মৌলবাদীদের হাতে তুলে দিতে আমার এই বাংলাদেশ স্বাধীন হয় নি। রাজাকারদের মন্ত্রিত্ব দিয়ে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তিকে দেশ চালানর দায়িত্ব দিতে আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয় নি। বাংলাদেশ কে পাকিস্তান করার জন্য আমার দেশের মা বোনেরা সম্ভ্রম হারায়নি। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক যৌনক্ষুধা অক্ষুণ্ণ রাখতেই বলপূর্বক ধরে নিয়ে গিয়ে শরীর থেকে বস্র ছিঁড়ে ছিঁড়ে গণ ধর্ষণ এর শিকার হয়েছিলো ২ লক্ষেরও বেশি পূর্ব বাংলার নারীগণ। এই ত্যাগ এর বিনিময়ে আর রক্ত দিয়ে কেনা বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হয়ার কথা ছিল।

মৌলবাদীদের কাছে হেরে গিয়ে ওদের হাতে দেশ চালানোর গুরুদায়িত্ব দিয়ে অভিশাপ ডেকে আনার জন্য বাংলাদেশ স্বাধীন হয় নি। প্রয়োজনে ইতিহাস কে আবার ফিরে আসতে হবে। ১৯৭১ এর শেষ হয়ে যাওয়া যুদ্ধ আবার শুরু হবে। ১৯৭১ এর রয়ে যাওয়া বাকি স্বাধীনতা বিরোধী পাকি রক্ত, পাকি প্রেমী, রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার পরিবার ও সন্তানদের খুঁজে খুঁজে বের করে মারা হবে। যারাই আমার মাতৃভূমিকে নষ্ট করবে, বিবস্র করবে, স্বাধীনতাকে অস্বীকার করবে, হয় মরবে নাহলে বিবস্র করে জুতার একটা মালা গলায় পড়িয়ে পাকিস্তান কে ফিরিয়ে দেয়া হবে। ভুলেও আমার মাতৃভূমির বিরুদ্ধে কোন কথা বলার দুঃসাহস যে করবে প্রত্যেকের অবস্থা এক এ রকম হবে।

আমি আমার দেশ কে ভালবাসি। আমি এই দেশের সন্তান। গর্ব করে বলি আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। আমার দাদু, আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। দেশকে স্বাধীন করেছেন। বাবা আর দাদুর মত লক্ষ লক্ষ মানুষ যুদ্ধ করেছেন পূর্ব বাংলাকে ভালবেসে। রক্ত দিয়ে উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশ। যারাই এই ত্যাগের কথা ভুলে গিয়ে এর বিরুদ্ধে কথা বলবে, অসম্মান করার আস্পর্ধা আর দুঃসাহস দেখাবে, তাদের কাউকেই ক্ষমা করা হবে না। আজকের প্রজন্ম খুব ভাল করেই জানে কি করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়। কি করে উচিৎ জবাব দিতে হয়। কি করে মৌলবাদ রাজনীতির বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়াতে হয়। দেশটা শুধু মৌলবাদীদের নয়। দেশ টা আমার, আপনার সবার। মুসলিম, হিন্দু, বোদ্ধ, খ্রিস্টান, উপজাতি সবার। জাতির পিতা সেই ১৯৭১ এ সুনিপুণ ভাবে আমাদের কে শিখিয়ে গেছেন। ইতিহাস সাক্ষী, কোন শিক্ষাই বিফলে যায় না। এই শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর আমরা এই মতাদর্শেই বিশ্বাসী।