সংবিধানে ইসলাম নয়, ইসলাম হবে সংবিধান- এ কেমন হঠকারিতা

১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এই স্বাধীনতা পাওয়ার পিছনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তর এর মানুষ দের অবদান অনস্বীকার্য। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ। খ্রিস্টান, উপজাতি সকলে মিলে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের পায়ের নিচে পিষ্ট পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অবস্থা দিনে দিনে নিঃশেষ হচ্ছিল,ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হলে নতুন দেশটি হবে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। সর্ব স্তরের মানুষ নিজ নিজ প্রথা ও কৃষ্টি অনুসারে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবে। দেশে সবাই মিলে মিশে এক হয়ে থাকতে পারবে। কোন ভেদাভেদ থাকবে না।

বঙ্গবন্ধুর এই কথা শুনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরের মানুষ একটা সুন্দর ধর্মনিরপেক্ষ দেশ পাবার স্বপ্নে ঝাঁপিয়ে পরেছিল মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করার পর দেশ স্বাধীন হয়েছিলো। এই যুদ্ধে অনেকে সর্বস্ব হারিয়েছিল। তার পর স্বপ্নও ছিল একটা সুন্দর ধর্মনিরপেক্ষ দেশের। যে দেশে আগামী প্রজন্ম যেন বাঁচার মতো বাঁচাতে পারে।

এবার বলি আজকের স্বাধীনতার পরবর্তী কালিন সময়ের কথা। দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশের জন্ম হল। বাংলাদেশ এর একটা সংবিধান হল। কিন্তু দেশ কি ধর্মনিরপেক্ষ হল? আমাদের সংবিধান কি বলে? আসুন একটু পর্যালোচনা করি।

প্রথমত , বাংলাদেশ যদি একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হয় তাহলে সংবিধানে কেন শুরুতেই “বিসমিল্লাহির-রহমানির রহিম” বলে শুরু করা হয়েছে? একটা সুনির্দিষ্ট ধর্মকে কেন একক ভাবে প্রাধান্য দেয়া হবে? যদি ইসলাম ধর্ম দিয়ে সংবিধান শুরু করা হয় তাহলে ইসলামের পাশাপাশি বাংলাদেশের যত অমুসলিম নাগরিক আছেন তাদের সকলের ধর্মীয় গ্রন্থের প্রথম লাইন সংবিধানে সর্বপ্রথম অন্তরভুক্ত করা হোক। এটা অত্যন্ত ন্যায় এবং যুক্তিসঙ্গত একটি দাবি। একজন বাংলাদেশ এর সচেতন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের ভুল সুদরে দেয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

কারন বাংলাদেশে শুধু ইসলাম ধর্মালম্বি মানুষের বসবাস নয়। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ , খ্রিস্টান, উপজাতি সকলে মিলে বসবাস করে। সকলের সমান অধিকার। আর এই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ণ সম্মান দিয়েই রাষ্ট্র কে তার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। এবং এর যথোপযুক্ত প্রয়োগ চাই।

দ্বিতীয়ত, যদি বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন দেশ হয়ে থাকে তাহলে কেন আমাদের রাষ্ট্র ধর্ম থাকবে? কিসের ভিত্তিতে আমরা একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন দেশের রাষ্ট্র ধর্ম সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করছি ? কেনই বা করছি? এটা কি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া যে অমুসলিম বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার সীমাবদ্ধ করে রেখেছে সংখ্যা গরিষ্ঠ কট্টর মুসলিমরা? তারা এই দেশের নাগরিক থাকতে পারবে কিন্তু অধিকার সহজে পাবে না? (বাংলাদেশ সংবিধান ৫ এর ২ এর (ক) অনুচ্ছেদ।

অমুসলিমরা ধর্ম শান্তিতে পালন করতে পারবে কি পারবে না সেই অধিকার দেয়ার রাষ্ট্র কে? মুক্তিযুদ্ধ যখন হয়েছিলো তখন সবাই একসাথে ঝাপিয়ে পরেছিল শুধু মাত্র দেশ মাতাকে বাঁচাতে। একটি ধর্ম নিরপেক্ষ দেশের জন্য। আর দেশ স্বাধীন এর পর এই মানুষ গুলর অধিকার এ বাদ দিয়ে দেয়া হল?

আদৌ কি কোন অমুসলিম নাগরিক শান্তিপূর্ণ ভাবে ধর্ম পালন করতে পারে? সংখ্যা লঘূ দের উপর অত্যাচার এর বর্ণনা দেয়া যদি শুরু করি তাহলে এই বর্ণনা শেষ হবে না। রাষ্ট্র কি আদৌ তার দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করছে এক্ষেত্রে? যদি করত তাহলে বুঝতাম দেশ আসলেই স্বাধীন হয়েছে। পরাধীনতার গ্লানি ধীরে ধীরে একটা জাতিকে এভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে না।

তৃতীয়ত, একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশের, একটি রাষ্ট্রের মূলনীতিতে যদি একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে তা অনন্য অমুসলিম নাগরিকদের উপরে প্রনয়ন করা হয় তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এতে করে একটা নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। তার ধর্মের প্রতি অসম্মান করা হয়। তার ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করা হয়।

আপনার ধর্মীয় বিশ্বাস বা আমার ধর্মীয় বিশ্বাস এক নাও হতে পারে। আপনাকে জোরপূর্বক যদি ধর্মীয় গোঁড়ামি আর আস্থা চাপিয়ে দেয়া হয় দৈনন্দিন কর্মক্ষেত্রে, হাটে বাজারে, বার্তা লাপে আপনার কামন লাগবে? আর যারা ধর্ম মানে না? ওদের? অরাও তো এই দেশের নাগরিক। কি, নাগরিক নয়? তাহলে ওদের অবস্থা দয়া করে একটু ভাবুন। আমরা সবার আগে মানুষ। ঐযে কোথায় বলে সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই। যদি মানুষ এ না বাঁচে ধর্ম রক্ষা করবেন কাদেরকে ঘিরে? এত দাপট কোথায় যাবে? এত লাফালাফি ,মাতামাতি, জোর জবরদস্তি কি করে করবেন? যা নিয়ে এত মাতামাতি এবার সংযুক্ত করা একটা প্ল্যাকার্ড দেখুন ভাল করে। সংবিধানে ইসলাম নয়, ইসলাম হবে সংবিধান

এই কি চেয়েছিলেন আপনারা? এটাই কি একটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা?

কিন্তু এত্ত বড় মাপের একটা আইনী প্রহসন করে সবার ঠিক কী লাভ হল তার হিসাব মিলানো গেলনা কোন ভাবেই । এই ইসলামী রজত্বতো কায়েম হয়ে গেছে বাংলাদেশ এ বেশ কয়েক বছর হল । আজকাল আরও বেশি করে সহি সালামত ভাবে প্রভাব দেখা যায় । হিজাবের আড়ালে ডাগর ডাগর নয়নে ভরা কাজল মেখে পাহার সমান চুল ফুলিয়ে ফিটিং বোরখা পরে আধুনিক মুসলিম নারীগণ হেলে দুলে চলেন। এখন দিন দুপুরে মাইকে ঘোষণা দিয়েই দা কুড়াল হাতে হিন্দু মারতে যাওয়া যায়, কেউ কিছু বললে, মালাউন কতলে যাচ্ছি শুনলেই সাববাস বলে পীঠ চাপড়ে রাস্তা পরিষ্কার করে দেন। সংখ্যালঘু নিপীড়ন, ধর্ষণ, সম্পত্তিদখল, নারীনির্যাতন তো রোজকার ডাল ভাত ঘটনা। এগুলো না থাকলেই বরং শান্তি থাকে না আপনাদের ঘরে, নাস্তিকদের চাপাতি হাতে রাস্তাঘাটে, বাসায় অফিসে কোপানো যায়, ঠিক ঘাড়ের কোন জায়গায় কোপটা দিলে, বুকের কোন অংশে কোপ দিলে বাঁচার আর রাস্তা থাকে না স্পেসাল ট্রেনিং দিয়ে তা শেখানো হয় হাতে কলমে। সামান্য কার্টুন আঁকলে বায়তুল মোকারমের খতিবের পা চেপে ধরে ক্ষমা চাইতে হয়, ইসলামের বিরুদ্ধে ফেসবুকে শিশুসুলভ প্রশ্ন করলেও প্রথমে ৫৭ ধারায় গ্রেফতার তার পরে ১০/১২ দিনের রিমান্ডে নিয়ে আল্লার রস্তে সেই লেভেল এর মাইর । মাঝে মাঝে মাইর খেয়েই ভুক্তভুগির অকাল মৃত্যু হয় । প্রতিবাদের কেউ নাই। আর ভুল ক্রমে কেউ বেঁচে গেলে ,বহু বছরের জেল হয়ে যায়, সেকুলার কথাবার্তা লেখা লেখক/ব্লগারদেরও তাড়িয়ে দেশ ছাড়া করা হয়, পুলিশের কাছে গেলে ‘ওরে বাবা, আর কত লিখবি রে , বাপু, তোমরা আমাদের আর না জ্বালাইয়া দেশ ছাড়তো’ শুনতে হয়, শিয়া উপাশানালয়ে যখন তখন বোমা মারা যায়, গত কয়েক দশকে হাটে মাঠে ঘাটে বোরকা-হিজাব-নিকাবের জয়জয়কারও মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছে – বাকিটা ছিল কী? আমাদের সরকারের কাছে সেকুলারিজম মানে যেরকম সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকে আরও শক্তিশালী করা ঠিক তেমনি আমাদের দেশে গণতন্ত্র মানেও সংখ্যাগরিষ্ঠের পেশীর জোড়ে রাষ্ট্রধর্ম কায়েম করা। এবার তো মনে হয়, রাষ্ট্রধর্মের লিগালিটিকে বুকে নিয়া ইসলামি জোশে বলীয়ান সরকার, আদালত এবং ধর্মান্ধ মুসলিম ভাইদের হেফাজতিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাইকে কতলের ডাক দেওয়াতে আর কোন বাঁধাই থাকলো না। আসলেই তো, ইসলাম থাকতে আর সংবিধান দিয়ে কী হবে?

বিশের দ্রষ্টব্যঃ সংবিধানে কিন্তু লেখা আছে ধর্মের কারনে কোন বৈষম্য হবে না। প্রমান স্বরূপ স্ক্রীন সট দিলাম।