নাগরিক নিরাপত্তা ও ব্যর্থতা প্রসঙ্গে

গতকাল থেকেই বিশাল এক হতাশা ভর করেছে। বারবার কয়েক টুকরো চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়, “নিরাপত্তা” নিয়ে, কূলকিনারা পাবো বলে মনেও হচ্ছেনা।

আমাদের দেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ, উন্নয়নশীল দেশ বলেই জানি। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়ে দেশের সরকার যে এতো উদাসীন হতে পারে, তা কিছুতেই বোধগম্য হয়না। সম্প্রতি আমাদের দেশে দেখছি বিভিন্ন ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, বিদেশী নাগরিক, ধর্মযাজক, পুরোহীত, অধ্যাপক, নাট্যকর্মী, সমাজকর্মী, সংখ্যালঘু হত্যার ঘটনা ইত্যাদি। গত পরশু দেখলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা। চট্টগ্রামে এক দুর্ধর্ষ পুলিশ অফিসারের স্ত্রীকে মেরে ফেলা হলো, একই দিনে ঢাকায় আরেক পুলিশ অফিসারের মা-কে গলা কেটে হত্যা করা হলো, খুন হলো সাধারণ এক খ্রিষ্টান মুদির ব্যবসায়ী।

তবে উপরের সব কিছুর থেকেও আমাকে অবাক করেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য। এবার তিনি পুলিশের স্ত্রীর হত্যাকান্ড-কে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেননি। তিনি বলেছেনঃ “জঙ্গিরাই পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতুকে হত্যা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।” বাহ! চমৎকার।

তাহলে শেষ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করে নিলেন যে দেশে জঙ্গিবাদ বেড়ে গেছে এবং হত্যাকান্ডগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং জঙ্গি হামলা।

আমি ভেবে খুব অবাক হই, আমরা কি এতটাই অপারগ যে এই জঙ্গিবাদ দমন করতে পারি না? ছোট্ট একটি দেশ। তার মধ্যে সমস্যা কিছু থাকবেই, তাই বলে জঙ্গিবাদের মাত্রা এতো বেড়ে যাবে তা কিন্তু মেনে নেওয়া যায় না। নিচে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ডগুলোর একটি খসড়া তালিকা দেওয়া হলোঃ

রাজীব হায়দার ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
সাফিউল ইসলাম ১৫ নভেম্বর ২০১৪
অভিজিত রায় ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫
যোগেশ্বর রায় ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬
ওয়াশিকুর রহমান ৩০ মার্চ ২০১৫
অনন্ত বিজয় দাশ ১২ মে ২০১৫
নিলয় নীল ৭ অগাস্ট ২০১৫
অর্ঘ্য বোস ৭ অগাস্ট ২০১৫
ফয়সাল আরেফিন দীপন ৩১ অক্টোবর ২০১৫
নাজিমুদ্দিন সামাদ ৬ এপ্রিল ২০১৬
রেজাউল করিম সিদ্দিক ২৩ এপ্রিল ২০১৬
জুলহাজ মান্নান ২৫ এপ্রিল ২০১৬
তনয় মজুমদার ২৫ এপ্রিল ২০১৬
নিখিল জোয়ারদার ৩০ এপ্রিল ২০১৬
মুং সুয়ে চক ১৪ মে ২০১৬
সানাউর রহমান ২০ মে ২০১৬
দেবেশ চন্দ্র প্রমানিক ২৫ মে ২০১৬
মাহমুদা আক্তার ৫ জুন ২০১৬
রঞ্জিত রোজারিও ৫ জুন ২০১৬
অনন্ত গোপাল গাঙ্গুলি ৭ জুন ২০১৬

একটু খেয়াল করে দেখুন, ২০১৫ সালে আমাদের জানা মতে ৯ টি হত্যাকান্ড হয়েছে, যার দায়িত্ব নিয়েছে ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী। যা আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবরই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। বিচার শেষ হয়নি একটি মামলারও। ধরা পরেনি একটি খুনি, বরং বিদেশে পালিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশ প্রধান। যার ফলশ্রুতিতে ২০১৬ সালে আমরা দেখতে পাচ্ছি ইতিমধ্যে ১০ টি হত্যাকান্ড হয়ে গিয়েছে। বছর শেষ হতে এখনও আরো ৬ মাস বাকি।

দেশে জঙ্গি হত্যাকান্ডের মাত্রা গত বছর থেকে এ বছরে বেড়েছে তা বুঝতে জটিল কোন অংক কষতে হবে না। আরেকটু খেয়াল করলে আরেকটি জিনিস দেখতে পাবেন যে, এ বছর যতোগুলো হত্যাকান্ড হয়েছে তার সবই হয়েছে গত ৩ মাসে। এই মাসের মাত্র শুরু। মাস শেষ হতে হতে কি হয় কে জানে?

আমি ভয়ে থাকি, খুবই ভয়ে থাকি। দেশে আমার পরিজনদের নিয়ে সারাক্ষনই সংশয় কাজ করে। ভেবে পাইনা এই অবস্থায় করনীয় কি? একটি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন জঙ্গিগোষ্ঠীদ্বারা পরিচালিত হত্যাকান্ডগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেন, তখন আমাদের মতো ক্ষুদ্র মানুষদের ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। একটি রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন কেউ নাস্তিক্যবাদী লিখার কারনে হত্যা হলে তার দায়ভার সরকার নিবে না, তখন ভয় পাই। জঙ্গিবাদের মাত্রা হঠাত করে বেড়ে গেলো, তার দায়ভার সরকার নিবেনা তা হতে পারেনা। একটি খুনিও ধরা হলোনা, তা মানতে পারিনা। সাধারন নাগরিক হিসেবে আমার নিরাপত্তার সকল ভার সরকারের ওপরই বর্তায় এবং এতে ব্যর্থ হলে তার সম্পূর্ণ দায় পুরোপুরি সরকারের। তাই বারবারই এই একটি ইস্যুতে সরকারকে ব্যর্থ বলেই আমার মনে হয়। কারন, যে দেশ একজন পুলিশ অফিসারের স্ত্রী কিংবা কর্নেল-এর মা’র নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেখানে আমাদের মতো সাধারন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে এটাই স্বাভাবিক বলে আমার মনে হয়।

আমি এই আর্টিকেলটি লিখতে লিখতেই আরেকটা খবর পেলাম, ঝিনাইদহে এক মন্দিরের পুরোহিতকে গলা কেটে হত্যা করেছে মোটরসাইকেলে আসা তিন যুবক। খবরটি পড়ে লিখার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আর লিখতে ইচ্ছে করছেনা। প্রচন্ড মনঃকষ্টে ভুগছি।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ সরকার হিসেবে দেখতে চাইনা। সকল হত্যাকান্ডের বিচার চাই, খুনিদের সর্বচ্চো শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।