সময় এসেছে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর

বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে আমরা মোটামোটি সবাই অবগত। ’৭১ সালে পাকসেনা নির্বিচারে হত্যা করেছিলো আমাদের দেশের সাধারন নিরীহ জনতা তথা বুদ্ধিজীবীদের। আমাদের দেশের কিছু সংখ্যক স্বার্থান্বেষীগোষ্ঠী যোগ দিয়েছিলো তাদের এই অপকর্মের সাথে। খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, কিছু করতেই বাকি রাখেনি তারা। আমরাও একযোগে রুখে দাঁড়িয়েছিলাম এই অপশক্তির বিরুদ্ধে এবং ছিনিয়ে এনেছিলাম আমাদের স্বাধীনতা।

স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর হঠাৎ করেই যখন দেখি আমাদের এই স্বাধীন দেশে আবারো হত্যাকান্ড হচ্ছে, তখন মূষরে পড়ি। মনের অজান্তেই এক অজানা অস্বস্তিতে বিচলিত হই।

যদিও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আমাদের বাংলাদেশের মূলনীতির পরিপন্থী, কিন্তু সেই ১৯৭৯ থেকেই শুরু হয়েছিলো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। এবং পরবর্তীতে সংগঠিত হতে থাকে ধর্মের নাম দিয়ে জঙ্গিবাদ। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলোর সম্পর্কেও কিন্তু আমরা সবাই জানি বা পত্রিকাতে পড়ছি প্রতিনিয়ত। জঙ্গিরা ধর্মের দোহাই দিয়ে একের পর এক খুন করেই চলেছে। আমাদের মতো সাধারন মানুষ কিন্তু এইসব জঙ্গিদের দ্বারা সংগঠিত হত্যাকান্ডগুলো নিয়ে মাথা ঘামাই না। কতিপয় অসাধু রাজনীতিবিদরা যখন ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে তখনও আমরা কিছু বলিনা, শুধু শুধু ভেজালে জড়াতে চাইনা বলে চুপ করেই থাকি বেশিরভাগ সময়। সংবেদনশীল ঘটনা বলে চুপ করে থাকি। আবার যখন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক বা রাজনীতির দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক কর্মী ধর্ষণ করে, তখনও আমরা সাধারন জনতা চুপ করেই থাকি, নানা ধরনের ঝামেলা এড়াতে।

ঠিক এই সুযোগটাই কাজে লাগায় ধর্ম নিয়ে রাজনীতির নামে ব্যবসা কিংবা ধর্মের নামে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম পরিচালনাকারীরা। আমি কখনো কোন সন্ত্রাস/জঙ্গিবাদের জন্য বিশেষ কোন ধর্মকে দায়ী করিনি, করবোও না। অপরাধকারী যে ধর্মের হোক, তার পরিচয় সে একজন অপরাধী। তার অপরাধের জন্য গোটা ধর্মকে দায়ী করাও ঠিক নয়। তবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ঘোর বিরোধী। আমি মনে করি ধর্ম একটি ব্যক্তির একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়, বিশ্বাসের স্থান। আর এই বিশ্বাসের স্থান নিয়ে রাজনীতি কিংবা ব্যবসা করা মোটেও উচিত নয়। মানুষের মধ্যে বিভক্তিরও সৃষ্টি হয় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে, যা একটি দেশের জন্য কখনো সুফল বয়ে আনে না। এবং এর উদাহরণ হিসেবে দেখছি আজকের এই বাংলাদেশ।

একটু খেয়াল করলে আবার দেখবেন যে, নাস্তিক/আস্তিকের ইস্যুতে কিংবা ধর্ম অবমাননা নিয়ে কিন্তু ধর্মপ্রাণদের প্রতিবাদের অভাব দেখা যায় না। কিন্তু যখনই ধর্মের নাম নিয়ে কোন অপরাধ সংগঠিত হয়, তখন সবার মুখে কুলুপ এঁটে যায়। তখন কেউ টু শব্দটুকু করে না। তখন দেখিনা একজন হেফাজত কিংবা জামাত কর্মী মাঠে নেমে আনসার বাংলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে। আর কেউ যদি প্রতিবাদ করতে আসে তখন দেখা যায় যে যার অবস্থান থেকে ডিফেন্ড করতে শুরু করে দেয়।  তখন অনেকেই বলে থাকেনঃ “ওরা সত্যিকারের ধর্ম পালন করে না”, “ইসলামে এসব শিখায় নি”, “আদালতে প্রমাণ হয়নি”, “ঘটনার কোন সাক্ষি নেই” ইত্যাদি  ইত্যাদি।

আবার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সরকারের কিন্তু অবস্থান অনেকটা অপরিষ্কার। গত ৫-৬ দিন ধরে প্রশাসন জঙ্গিবাদ নিধন করতে নামলেও কিছুদিন আগেও কিন্তু প্রেক্ষাপট ছিলো বেশ ভিন্ন। ২০১৩ থেকেই শুরু হয় জঙ্গিদের দ্বারা সংগঠিত হত্যা কান্ড। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ -তে রাজীব হায়দার, ১৫ নভেম্বর ২০১৪-তে সাফিউল ইসলাম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫-তে অভিজিত রায়, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬-তে যোগেশ্বর রায়, ৩০ মার্চ ২০১৫-তে ওয়াশিকুর রহমান, ১২ মে ২০১৫-তে অনন্ত বিজয় দাশ, ৭ অগাস্ট ২০১৫-তে নিলয় নীল, ৭ অগাস্ট ২০১৫-তে অর্ঘ্য বোস, ৩১ অক্টোবর ২০১৫-তে ৩১ অক্টোবর ২০১৫, ৬ এপ্রিল ২০১৬-তে নাজিমুদ্দিন সামাদ, ২৩ এপ্রিল ২০১৬-তে রেজাউল করিম সিদ্দিক, ২৫ এপ্রিল ২০১৬-তে জুলহাজ মান্নান, ২৫ এপ্রিল ২০১৬-তে তনয় মজুমদার, ৩০ এপ্রিল ২০১৬-তে নিখিল জোয়ারদার, ১৪ মে ২০১৬-তে মুং সুয়ে চক, ২০ মে ২০১৬-তে সানাউর রহমান, ২৫ মে ২০১৬-তে দেবেশ চন্দ্র প্রমানিক, ৫ জুন ২০১৬-তে মাহমুদা আক্তার, ৫ জুন ২০১৬-তে রঞ্জিত রোজারিও, ৭ জুন ২০১৬-তে অনন্ত গোপাল গাঙ্গুলি ছাড়াও আরও অনেকেই খুন হয়েছেন এই জঙ্গিদের হাতে, আর ধর্ষণের কথা তো লিখে শেষ করার মতো না, অহরহ আমাদের বোনরা হচ্ছে ধর্ষণের শিকার। সরকার কিন্তু এসকল খুনিদের কিংবা ধর্ষকদের বিচারের আওতায় আনতে অপারগ ভুমিকা পালন করেছেন। তবে বাবুল আক্তারের স্ত্রী হত্যার পর থেকে গত কয়েকদিন ধরেই প্রশাসন চালাচ্ছে সাঁড়াশি অভিযান। যেহেতু এ বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কোন ধারনা পাইনি, সেই কারনেই কোন ভালো-মন্দ মন্তব্য করবো না।

কিন্তু আমার মনে দাগ কেটে গেছে পুলিশের আইজিপির একটি কথা “ঘরে ঘরে পাহারা দিয়ে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পারবে না। এ জন্য প্রত্যেকের নিরাপত্তাবোধের পাশাপাশি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা থাকবে।”

আসলেই তো, প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা না দিতে পারলেও, আমরা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি বিভিন্ন ভাবে। তার মধ্যে প্রথমেই যা মনে আসে আমার, তা হলো, এসব জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একজোট হয়ে প্রতিবাদ গড়ে তোলা। অপরাধীদের বিরুদ্ধে সবাই যে যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করলে তখন সরকারও চাপের মধ্যে থাকতো, নিরাপত্তা জোরদার করে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বাধ্য হতো। কোন পুলিশ সদস্য এভাবে প্রকাশ্যে বলতে পারতো না “ঘরে ঘরে পাহারা দিয়ে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পারবে না।”

আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষ যদি একটু সৎসাহস বুকে নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলতে পারতো, তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসতো, অন্তত সরকার/প্রশাসন জঙ্গিবাদ উৎপাটনের জন্য চাপে থাকতো। তাছাড়া জঙ্গিদের সংখ্যা নিশ্চয় সারাদেশের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি নয়।

এবং ঠিক এই কারনেই অনেক সময় বলতে ইচ্ছা না থাকলেও এই দায়টা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের ওপরই বর্তায়। তাই বলবো, আসুন সবাই মিলে এসব জঙ্গিগোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি। মুখে মুখে ধর্মরক্ষার বুলি না ঝেড়ে আসুন আরেকবার দেশরক্ষার্থে কাজ করি। হয়তো জঙ্গিরা আমাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী, তবে আমরা কিন্তু বীরের জাতি, ’৭১ সালে পাকবাহিনীদের কিন্তু আমরাই বিতাড়িত করেছিলাম, সুতরাং এবারও পারবো, জঙ্গিমুক্ত দেশ গড়তে।