হায়রে আমার সাপ্রদায়িক সম্প্রীতি!

অনেকেই বলে থাকেন আমাদের দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এদেশে সবাই একসাথে মিলেমিশে বাস করে। হ্যাঁ করতো, কিন্তু এখন আর সেই সম্প্রীতিটুকু নেই। আগের সেই আন্তরিকতাটুকুও কমে গেছে অনেকাংশে। এখন সংখ্যগরিষ্ঠদের মধ্যে শুধু ধর্মীয় অনুভুতিটাই বেশি দেখা যায়।

যাই হোক আমার মতে, অপরাধী, অপরাধীই। সে যেই দল বা ধর্মেরই হোক না কেন। কিন্তু কোন বিশেষ দল তার অপরাধী কর্মীদেরকে বিচারের আওতায় না আনে, তখনই খারাপ লাগে। কিন্তু এই বিশেষ দলটি যখন আওয়ামীলীগ হয় তখন কিন্তু মর্মাহত হই, কারন এই আওয়ামীলীগ সরকারের ওপর বরাবরই আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস বেশি। এবং এই কারনেই আওয়ামীলীগের সাথে সরাসরি জড়িত না থাকলেও মোরাল সাপোর্ট কিন্তু যায় আওয়ামীলীগ এর পক্ষেই। কিন্তু যখন দেখি আস্থার এই জায়গা আমাদের ন্যুনতম নাগরিক নিরাপত্তা দিতে অপারগ, তখন সত্যিই দুঃখ লাগে। তবে এই সরকারের সময় হিন্দুসহ অন্য ধর্মের মানুষরা কতটুকু নিরাপদ তা নিয়ে আমার অনেক শংকা আছে।

বিগত ১-২ বছর ধরে কিভাবে অত্যাচারিত হচ্ছে সাধারন সনাতন ধর্মাবলম্বী নাগরিক, তা তো আমরা মোটামোটি সবাই জানি। হয়তো বলবেন, এগুলো করছে জঙ্গিরা, কিন্তু এ কাজ যদি জঙ্গিদের হয়ে থাকে তাহলে সরকার জঙ্গিবাদ দমনে অপারগ ছিলো। নিচে কিছু ঘটনা বলবো, তারপর হয়তো কিছুটা হলেও বুঝতে পারবেন।

শুধু মাত্র ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি/মার্চ মাসে প্রায় ৩০টি মন্দিরে ও ৪০টি হিন্দু বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। আক্রমণ করা হয়েছে আশেপাশের হিন্দুদের। বাসাবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সংখ্যালঘুদের। ঘটনাগুলো হলোঃ  ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩,  রাজগঞ্জ, নোয়খালি জেলার কালি মন্দিরে আক্রমণ করা হয়। আক্রমণ করা হয় টঙ্গিপাড় ও আলাদিনগরের হিন্দুবাসিন্দাদের। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বাইন্নাবাড়ি, নোয়খালি জেলার হিন্দু মন্দির পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, পিঙ্গযৌর, মোড়েল্গঞ্জ, বাগেরহাটের হিন্দু মন্দিরে  ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বাঁশখালি উপজেলার দক্ষিনজলদি এলাকায় প্রায় ২০ টি হিন্দু বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।  ওই ঘটনায় প্রায় ১৬ জন হিন্দু আহত হয়, নিহত হয় ২ জন। ৬৫ বছরের এক বৃদ্ধ হিন্দু মারা যান ওই ঘটনায়। ১ মার্চ ২০১৩, গাইয়ারচড়, লক্ষিপুর হিন্দু মন্দিরে মধ্যরাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। একই দিনে চন্দ্রগঞ্জে হিন্দুদের স্বর্ণের দোকানে চালানো হয় লুটপাট। ১ মার্চ ২০১৩, চর সীতা,  এলাকার হিন্দুদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। ২ মার্চ ২০১৩, নালচিড়া, গৌরনদী, বরিশালের পিংলাকাঠী সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরটি পুড়িয়ে ফেলা হয়। ২ মার্চ ২০১৩, রামচন্দ্রপুর, বাগেরহাটের এক হিন্দু মন্দির পুড়িয়ে ফেলা হয়। ৩ মার্চ ২০১৩, গোয়ালিমন্দ্র, মুনসিগঞ্জ-এর কালি মন্দির আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছে। ৩ মার্চ ২০১৩, আলিডাঙ্গা শিবগঞ্জ, নওয়াবগঞ্জ-এ সার্বজনীন পূজা সংঘ মন্দিরও পুড়িয়ে ফেলা হয়। ৪ মার্চ ২০১৩, লাকিরপার, গোলাপগঞ্জ-এ কালি মন্দিরে আক্রমণ করা হয়। ৪ মার্চ ২০১৩, রথেরপাড়, আদিতমাড়ি, লালমনিরহাটে কালি মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়। ৫ মার্চ ২০১৩,  নাথপাড়া, চট্টগ্রামে খেত্রপল মন্দিরে আগুন দেওয়া হয় এবং আশেপাশে হিন্দু বাড়িতে আক্রমণ করা হয়। ৫ মার্চ ২০১৩, গথিয়া, উজিরপুর, বরিশাল গথিয়া সার্বজনীন মন্দিরে আক্রমণ করা হয়। ৫ মার্চ ২০১৩, পাকুরিয়া সিংরা, নাটোরে হরি মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়। ৬ মার্চ ২০১৩, চাপাতালি, দাউদকান্দি, কুমিল্লাতে একটি হিন্দু মন্দির পুড়িয়ে ফেলা হয়। ৬ মার্চ ২০১৩, বাংলা দাশপাড়া, নেত্রকোনাতে আক্রমণ করা হয় একটি হিন্দু মন্দির। ৬ মার্চ ২০১৩, বাতাজোর, বামনা, বরগুনাতে আক্রমণ করা হয় রাধাকৃষ্ণ মন্দির, পরে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে মন্দিরটি। ৬ মার্চ ২০১৩, পাকশিয়া বুরহানুদ্দিন, ভোলা-তে কালি মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়। ৭ মার্চ ২০১৩, শ্মশানগাও, মুন্সিগঞ্জ-এ কালি মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়। ৮ মার্চ ২০১৩,  আমাশু কুকরুল পূর্বপাড়া, রংপুরে রাধা গোবিন্দ মন্দিরে আক্রমণ করা হয়, আহত হয় অনেকেই। ১০ মার্চ ২০১৩, আছিম বাজার, ফুলবাড়ি, ময়মনসিংহে আগুন দেওয়া হয় কালি মন্দিরে। ১১ মার্চ ২০১৩, খালকুলা কালিগঞ্জ, ঝিনাইদহে আগুনে পুড়ানো হয় শিব মন্দির। ১১ মার্চ ২০১৩, কাফিলাবাড়িয়া, গোপালগঞ্জ-এ দুর্গা মন্দির পুড়িয়ে ফেলা হয়। ১১ মার্চ ২০১৩, আমতলী, জুরি, মৌলভীবাজারে পুড়ানো হয় রাধা গোবিন্দ মন্দির। ১২ মার্চ ২০১৩, পাকুরিয়া গ্রাম, নাটোরে হরি মন্দিরে ব্যাপক ভাংচুর চালায়, আশেপাশের হিন্দু বাড়িতেও চালায় অতর্কিত হামলা। ১২ মার্চ ২০১৩, কুরিপাইকা, পটুয়াখালিতে আক্রমণ করা হয় রাধা গোবিন্দ মন্দির। ডাকাতি করে নিয়ে যায় মদনমোহন মূর্তি ও প্রায় ২.৫ ভরি স্বর্ণালংকার। ১২ মার্চ ২০১৩, ভাতিখানা রোড, বরিশালে দুইটি হিন্দু বাড়ি আগুনে পুড়ানো হয় রাত ২.৪৫ টার দিকে।  ১৫ মার্চ ২০১৩, শেরপুর, ঢাকা-তে পুড়িয়ে ফেলা হয় মাধবপুর পুজা মন্দির। ১৮ মার্চ ২০১৩, বোভালা, নেত্রকোনাতে পুড়ানো হয় হরি মন্দির। ১৮ মার্চ ২০১৩, দক্ষিন মারতা, শ্রীপুর, গাজিপুরে পুড়িয়ে ফেলা হয় কালি মন্দির। ১৯ মার্চ ২০১৩, সাবেকপাড়া, গাবতলি, বগুরাতে আগুন দেওয়া হয় হিন্দু মন্দিরে। ১৯ মার্চ ২০১৩, কর্মকার পাড়া, গাবতলি, বগুরাতে আগুনে পুড়ানো হয় হিন্দু মন্দির। ১৯ মার্চ ২০১৩, কামারচাট, গাবতলি, বগুরাতে আরো একটি মন্দির পুড়ানো হয়। ২২ মার্চ ২০১৩, কেশুরিতা মধ্যপাড়া, গাজীপুরে পুড়ানো হয় শ্রী শ্রী লক্ষীমাতা মন্দির। তাছাড়া ১২ মার্চ ২০১৩, শ্রীমঙ্গলে আমার নিজের বাসা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো, অনেক কষ্ট করে আমার মা বাসা থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। পুলিশের কাছে সহায়তা চেয়েও পাইনি।

উপরে শুধু ১ মাসের ঘটনা লিখেছি। সারা বছরে কি কি হয়েছে তা লিখে শেষ করা যাবে না। যেখানে শুধু এক মাসের মধ্যেই সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে ৩০-৩৫ টা ঘটনা যেখানে হিন্দু মন্দির ও বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে কিভাবে আমরা বলতে পারি বর্তমান সরকারের সময়ে হিন্দুরা সবচেয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত? এই কি তাহলে আমাদের ধর্ম নিরপেক্ষতা? এই কি আমাদের সাপ্রদায়িক সম্প্রীতি?