আসুন বাংলা চর্চা করি

জাতি হিসেবে বাঙ্গালি জাতির অনেক গৌরব। অনেক ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পাওয়া আমাদের এই ভাষা, যার নাম বাংলা। আমার ভাষা, আমার মায়ের ভাষা। আমরা যতই দেশের বাইরে থাকিনা কেন, কর্মক্ষেত্রে যতই ইংরেজি ভাষার চর্চা করিনা কেন, ঘরে ফিরে প্রিয়জনদের সাথে কিন্তু ঠিক বাংলা-তেই কথা বলি। মায়ের সাথে কিন্তু বাংলাতেই নিজের আবেগ প্রকাশ করে থাকি। এই কারনেই বোধয় বাংলা-কে আমাদের মাতৃভাষা বলা হয়।

আমি যতদূর জানি আমরাই একমাত্র জাতি যারা নিজের ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। ১৯৫২ সালে আমাদের পূর্বপুরুষরা ‘বাংলা’কে রাষ্ট্র ভাষা করার জন্য যুদ্ধ করেছেন, রক্ত দিয়ে ‘বাংলা’কে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করার অধিকার ছিনিয়ে এনেছিলেন। নাহলে হয়তো আজ এই লেখাটি উর্দুতে লিখতে হতো।

এসব তথ্য এবং ইতিহাস আমরা স্কুলে পড়াকালীন অনেক পড়েছি। বিভিন্ন টিভি ইন্টারভিউ-তে হঠাত করে ২১-শে ফেব্রুয়ারির কথা জিজ্ঞেস করলে হয়তো স্নায়বিক চাপে ভুল করে অন্য কোন দিবসের কথা বলে ফেলি, কিন্তু তারপরও আমরা বুকের মধ্যে ঠিকই বাংলা-কে ধারণ করি, ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে লালন করি। ছোটদের ভুল হবেই, ভুল থেকেই শিক্ষা নিবে, এই ভেবে কিছু বলি না। ভাবি থাক, ওরা তো এখনো বাচ্চা, আরেকটু বড়ো হোক, একসময় ঠিক শিখে যাবে বাংলা ও তার ইতিহাস সম্পর্কে।

কিন্তু বুকের ভেতর অন্য ধরনের এক চাপ অনুভব করি, যখন দেখি প্রাপ্তবয়স্করা ভাষাশৈলী দেখাতে গিয়ে ভিন্ন ভাষায় কথা বলছেন। আপনারা হয়তো ভাবছেন আমি সেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রীদের নিয়ে কথা বলছি, বিষয়টি কিন্তু মোটেও তা না। আমি ওদেরকেও “বাচ্চারা ভুল তো করতেই পারে”-এই কাতারেই ফেলেছি। আমি কথা বলছি দেশের বর্তমান প্রচলিত কথা বলার ধরন নিয়ে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ভাষাতত্ত্বের ছাত্র নই, বাংলা নিয়ে তেমন কোন পড়াশোনাও আমি করিনি। পড়াশোনার বিষয় “কম্পিউটার সায়েন্স” হওয়ার কারনে উচ্চমাধ্যমিকের পর থেকে বেশিরভাগ পড়াশোনাই হয়েছে ইংরেজিতে। কিন্তু তারপরও চেষ্টা করি ভালো করে বাংলা বলার। হয়তো ততো ভালো করে বলতেও পারিনা, কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে যাই। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার পরও মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য কিন্তু বাংলা ভাসাতেই লেখালেখি করে থাকি। কারন যতো যাই হোক না কেন, এই বাংলাকেই আমি বুকে ধারণ করি।

অনেকেই ভাবেন ইংরেজি কিংবা হিন্দি ভাষায় কথা বলা মানেই এক ধরনের স্মারটনেস। বাংলা ভাষায় কথা বললে দেখা যায় অনেকেই বলেন খ্যাত। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা না। কর্মক্ষেত্র কিংবা অন্যান্য পারিপার্শ্বিক কারনে অনেকেই ভিন্ন বিদেশি ভাষায় কথা বলা রপ্ত করে নেন। এতে মোটেও আপত্তি নেই। বরং ভালো, যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু তাই বলে নিজের ভাষাকে অসম্মান করা কিংবা নিচু দেখানো মোটেই ঠিক নয়।

আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা বলবো। দীর্ঘদিন ধরে ইংল্যান্ড এ বসবাস করার কারনে অনেক দেশের লোকের সাথেই কথা হয় কিংবা বিভিন্ন কাজ করা হয়। কারন ইংল্যান্ড এমন একটি দেশ, যেখানে মোটামোটি সকল দেশের মানুষই কমবেশি আছেন। যাইহোক, কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতার কারনে ইংল্যান্ড এ প্রতি বছর ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে অনেক লোকজন এসে থাকেন। কিন্তু বেশিরভাগ ইউরোপিয়ানরা নিজের মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষাতে কথা বলেন না। একদিন পর্তুগিজ এক ভদ্রলোক এর সাথে কথা হচ্ছিলো এই বিষয় নিয়ে। আমি ভাবতাম হয়তো তারা অলসতার কারনে ইংরেজি শিখেন না বা শিখতে আগ্রহী না। এই পর্তুগিজ ভদ্রলোক এর সাথে কথা বলে বিষয়টা পরিষ্কার হলো। তিনি ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে আমাকে বললেন যে, ইংরেজি শেখার আগ্রহ যে তাদের একদম নাই তা না, তারা ইংরেজি নাটক-চলচ্চিত্র দেখা থেকে শুরু করে গানও শুনে থাকেন ইংরেজিতে। কিন্তু সবকিছুর পরও পরতুগিজ ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষাতে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তাদের মনে হয়, এক ধরনের অপূর্ণতা রয়ে যায় বিদেশি ভাষায় কথা বলে। নিজের ভাষার প্রতি মায়ার টানেই নাকি অন্য কোন ভাষায় কথা বলতে চাননা তারা। তাদের মতে, অন্যরা যদি আমাদের সাথে কথা বলতে চায়, তারা আমাদের ভাষা শিখে আসুক, আমরাও তখন ওদের ভাষা শিখে নিবো। এক কথায় নিজের ভাষার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ্য করতেই অন্য কোন ভাষার প্রতি তাদের আগ্রহ তেমনটি নেই।

দীর্ঘদিন ধরে আরেকটি বিষয় আমি লক্ষ্য করেছি। বিদেশের মাতিতে যখন ভারতীয় কিংবা পাকিস্তানি কারো সাথে পরিচয় হয়, তখন কিন্তু তারা ইংরেজি জানলেও ঠিক নিজের ভাষা হিন্দি, উর্দু অথবা পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলা শুরু করেন। আমরা বাংলাদেশি জানলেও তারা ধরেই নেন যে আমরা হিন্দি কিংবা উর্দু বুঝতে কিংবা বলতে পারবো। আমাদের প্রতি তাদের এই ধরনের ব্যবহারকে আমি ভালো/খারাপ কোন আখ্যা দিবো না। কিন্তু তাদের এ ধরনের ব্যবহারে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে তারা তাদের মাতৃভাষা-কে সবসময় ভেতরে ধারণ করেন এবং যখন সুযোগ পান তখনই ব্যবহার করার সুযোগ কাজে লাগান।

কিন্তু আমাদের বেলায় ঠিক তার উল্টোটা ঘটে। আমরা অন্য ভাষায় কথা বলার জন্য যেন সব সময় তৈরী থাকি। কেউ আমাদের সাথে হিন্দিতে কথা বললেই আমরা তার জবাব হিন্দিতেই দিই, পারি কিংবা না পারি। অন্য কেউ কিন্তু আমাদের ভাষায় কথা বলার কিংবা শেখার চেষ্টা করে না, ওরা সূক্ষ্মভাবে ওদের ভাষায় কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে যায়, আমরাও ওদের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব বেমালুম ভুলে যাই।

আমাদের দেশের টিভি/রেডিও গুলোতেও একই অবস্থা। বেশিরভাগ মানুষ ভিনদেশী নাটক-চলচ্চিত্র দেখে থাকেন, বিদেশি গান সোনার অভ্যেসও মোটামোটি কমবেশি সবার। এটা মোটেও খারাপ বিষয় নয় যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের ভাষার চর্চা সঠিক ভাবে করে থাকি। সমস্যা হয়ে দাড়ায় তখনি যখন নিজের ভাষার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে দৈনন্দিন জীবনে বিদেশি ভাষার ব্যবহার করি। ইদানীং দেশে কারো সাথে কথা বললেই দেখা যায় তারা কথার মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ভিন্ন ভাষার প্রয়োগ করেন। বাংলাদেশি সকল রেডিওতেও একই অবস্থা, স্রোতাদের মন রাখতে সবাই হিন্দি গানই বেশি বাজান।  ব্যাপারটি বড়োই দুঃখজনক।

আমি যখন ইংল্যান্ড এ নতুন, অচেনা অজানার ভিড়ে যখন হঠাত কাউকে বাংলা বলতে শুনতাম আমার মনে হতো সে আমার অনেক আপনজন। হয়তো তাকে কখনো দেখিনি, চিনিও না, তারপরও মনে হতো সে তো আমার নিজেরই মানুষ, শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার কারনে। কিংবা লন্ডনের ব্রিক লেন-এ যখন দেখি রাস্তার নাম ইংরেজি ও বাংলা- দুই ভাষায় লিখা, তখন অজানা এক পাওয়ার আনন্দে মনটা ভরে যায়। আমি বিশ্বাস করি, আমার মতো প্রতিটি বাঙ্গালির অনুভূতিই এক।

প্রতিটি সন্তান তার প্রাথমিক শিক্ষা কিন্তু পরিবার থেকেই পেয়ে থাকে। তাই আমি প্রতিটি পরিবারকে আহবান জানাই, আপনারা দয়া করে বাসায় বাংলা চর্চা করুন, সন্তানদের বাংলা বলতে উদ্ভুদ্দ করুন। আপনারা আগ্রহ নিয়ে শেখালেই তাদের মধ্যে বাংলা চর্চা করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ আগ্রহ সৃষ্টি হবে। সন্তানদের বেশি করে বাংলা বই পড়তে দিন। এখন ডিজিটাল টেকনোলজির কারনে বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বাংলা শিক্ষার ডিজিটাল মাধ্যম রয়েছে। তাদের এসকল ইন্টার‌্যাক্টিভ বাংলা শিক্ষার জন্য আগ্রহী করে তুলুন। মনে রাখবেন, আপনাদের সন্তানই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের দ্বারাই একদিন এই দেশ ও দেশের কৃষ্টি রক্ষা হবে।

চলুন আমরা সবাই মিলে আজ থেকে বাংলা চর্চা করা শুরু করি। যে যেভাবে পারি, ভুল-শুদ্ধ মিলিয়েই মানুষ। ভুল করতে করতেই হয়তো একদিন ভালো করে শেখা হয়ে যাবে। ছোটবেলায় আমরা সবাই পড়েছি “গৌরব অর্জন করার চেয়ে রক্ষা করা কঠিন”, বিষয়টি কিন্তু আসলেও একটি কঠিন সত্য। তাই চলুন আমরা সবাই মিলে আমাদের এই গৌরবের এই ভাষা, বাংলা’র চর্চা করি। আমাদের ভাষা ও ঐতিহ্য রক্ষার গুরু দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই। আসুন আমরা সবাই মিলে আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করি।