সত্য পল প্রকাশ ও সেই তরুনীর জবানবন্দীতে অসঙ্গতি (প্রথম-পর্ব)

টেররিস্ট অবজার্ভার এক্সক্লুসিভ

গুলশান হামলায় জিম্মি দশা থেকে “বেঁচে” যাওয়া ভারতীয় নাগরিক সত্য পল প্রকাশ একজন “ভাগ্যবান” ব্যাক্তি। একই সাথে সেই অবস্থা থেকে “মুক্তি” পাওয়া তাহমিদের দু’জন মেয়ে বন্ধু ফাইরাজ ও তানহা তাঁরাও ভাগ্যবতী। কোরিয়ান ভদ্রলোক ডি কে হোয়াং এর গোপনে ধারনকৃত ভিডিওটি যারা দেখেছেন তাঁরা বোধকরি সকলেই দেখেছেন যে সেনাবাহিনীর অভিজানের ঠিক কিছুক্ষণ আগে গুলশানের সেই হোলি আর্টিজান ক্যাফে থেকে ৮ জন ব্যাক্তিকে ছেড়ে দিচ্ছে (ভিডিওতে ৮ জনকে দেখা যায়)। আপনাদের বুঝবার ও জানবার সুবিধার জন্য নীচে সেই ভিডিওটি আরেকবার দিয়ে দিচ্ছি।

উপরের ভিডিওতে মুক্তি প্রাপ্তরা দুইটি দফায় বের হয়েছেন বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

প্রথম দফায় বের হয়েছেন হাসনাত, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে এবং আরো দুইটি নারী। আমরা ধারনা করতে পারি এই দুইটি মেয়ে হচ্ছে তাহমিদের দুই মেয়ে বন্ধু যাদের নিয়ে তিনি সেদিন হোলি আর্টিজানে খাবার খেতে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় দফায় যারা বের হয়ে আসছেন অর্থ্যাৎ সামনের হাসনাত ও তার সাথে থাকা মেয়েদের বের হবার ঠিক একটু পর যে দুইজন বের হয়ে এসেছিলেন এই দুইজনের মধ্যে নীল জামা গায়ে থাকা ব্যাক্তিটি-ই হচ্ছে সত্য পল প্রকাশ আর কালো গেঞ্জি ও নেভী ব্লু জিন্স পরা ছেলেটি তাহমিদ।

2016-08-12_22h28_28

সত্য পল প্রকাশ একজন ভারতীয় নাগরিক। পেশায় চিকিৎসক। বাংলাদেশে তার প্রত্যয় মেডিকেল ক্লিনিক নামক একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। মাদকে আসক্ত ব্যাক্তিদের নিয়ে কাজ করেন জনাব সত্য পল প্রকাশ। কারো কারো মতে তিনি ভালো বাংলা বলেন, কারো কারো মতে আধো আধো। যদিও আমরা ব্যাপারটি সম্পর্কে নিশ্চিত নই।  সেই হামলার সময়ে থাকা তাহমিদের দুইজন বান্ধবী হচ্ছেন ফাইরাজ ও তানহা। উল্লেখ্য যে এই দুইজন নারী নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। (সূত্রঃ দৈনিক সমকাল)

2016-08-12_22h32_20

জনাব প্রকাশ গুলশান হামলার একজন প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটনার সময় তিনি সেখানে ছিলেন সুতরাং বাংলাদেশের গোয়েন্দাবাহিনী তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে যদিও শুরু থেকে হাসনাত ও তাহমিদের মত সত্যকে গ্রেফতার হতে হয়নি। এর একটা বড় কারন খুব সম্ভবত যে হাসনাত ও তাহমিদকে হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের ছাদে জঙ্গীদের সাথে দেখা গেছে কিন্তু সত্যকে দেখা যায়নি। ফলে শুরু থেকেই তিনি একটু সুবিধাজনক অবস্থায়। গুলশান হামলার ঘটনার পর থেকে গত কিছুদিন আগ পর্যন্তও সত্য পল প্রকাশের নামটি মিডিয়াতে তেমন আসেনি। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্লগার, আইনজীবি কিংবা সাধারণ মানুষ যখন সত্য পল প্রকাশের পরিচয় জানতে পারেন এবং এই ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে থাকেন তখন হঠাৎ করেই সত্য পল প্রকাশের নামটা আইন শৃংখলাবাহিনীর লোক, সরকারদলীয় সমর্থকেরা বার বার সামনে আনতে থাকেন। যেমন কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান এটিএন বাংলায় গত ৮ তারিখের একটি টকশো অনুষ্ঠানে বলেছেন যে সত্য পল প্রকাশ জঙ্গীদের দেয়া একটি কোরান শরীফ নিয়ে বের হয়েছিলেন।

আবার অন্যদিকে ফেসবুকে যারাই সত্য পল প্রকাশকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁদের সকলকেই অনলাইন আওয়ামীলীগ অন্ধ ভক্ত ও শুভাকাংখীদের মাধ্যমে নাজেহাল হতে হয়েছে। ভারতীয় সত্য পল প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলাটা তাঁরা অপরাধের পর্যায়ে বিবেচনা করেছিলেন। কেন করেছেন সেটির সদুত্তর অবশ্য তারা দিতে পারেন নি। একটা কথা সবারই মাথায় রাখতে হবে যে একজন জঙ্গী মানে জঙ্গী-ই। তার দেশ নেই, ধর্ম নেই। সে মানুষের শত্রু। সে শুভ বুদ্ধির শত্রু। সুতরাং ভারতীয়, ফিলিপিনো, আমেরিকান, বাংলাদেশী, থাই এই রকমের না ভেবে অবজেকটিভলি আমরা ভাবতে পারি। আমাদের উচিৎ যুক্তির দিকে নজর দেয়া, আবেগের দিকে নয়।

আজ বাংলা ট্রিবিউন নামের একটি অনলাইন পোর্টালে সত্য পল প্রকাশের জবানবন্দী প্রকাশিত হয়েছে। যেই জবানবন্দী তিনি আদালতে দিয়েছেন ১৬৪ ধারা অনুযায়ী। কিন্তু মূল লেখা শুরু করবার আগে প্রশ্ন থেকেই যায় যে আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট কিভাবে বাংলা ট্রিবিউনের হাতে এলো? এটি যদি সত্য পল প্রকাশ এই পত্রিকাকে দিয়ে থাকেন তবে সেটি দেবার এখতিয়ার কি জনাব প্রকাশের রয়েছে? কিংবা বাংলা ট্রিবিউন সেটি যে প্রকাশ করেছেন সেক্ষেত্রে আইন আসলে কি বলে?

একটি সাব-জুডিস ম্যাটারের একটি আদালতের ডকুমেন্টস দেবার ক্ষেত্রে বা প্রকাশের সুনির্দিষ্ট আইন থাকবার কথা। কেননা এই ধরনের জবানবন্দী মূলত ব্যবহার হবে এই গুলশান হামলার ক্ষেত্রে আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে। সেখানে এই জবানবন্দীর ব্যাপারে চুল চেরা বিশ্লেষন হবে, আলোচনা হবে, তর্ক-বিতর্ক হবে। আদালতের কার্যক্রম শুরু হবার আগেই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি বাংলা ট্রিবিউনের হাতে যেহেতু এসেছে, আমরা ধরে নিচ্ছি যথাযথ আইনী প্রক্রিয়া মেনেই সেটি হয়েছে। যদিও আমরা নিশ্চিত নই। তারপরেও আমরা ধরে নিচ্ছি এবং আমাদের এই লেখার পাঠক/পাঠিকাদের এই সুনির্দিষ্ট ব্যাপারটি নিয়ে হয়ত ভেবে দেখবেন।

এবার চলুন আমরা সত্য পল প্রকাশের জবানবন্দীতে ফিরে যাই। আপনাদের আগেই বলে নিচ্ছি যে সত্য পল প্রকাশের মত ঐদিন গুলশান হামলার আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী একই ঘটনার একটি বর্ণনা দিয়েছেন কালের কন্ঠ নামক বাংলাদেশের একটি পত্রিকাকে। যদিও সে সাক্ষাৎকার ১৬৪ ধারার জবানবন্দী নয় বরং এটি কালের কন্ঠের নিজস্ব রিপোর্ট তাই এই সত্য পল প্রকাশের বেলায় যে প্রশ্ন তুলেছি জবানবন্দী প্রকাশের ব্যাপারে, এই ক্ষেত্রে আর তা তুলছি না। কেননা এটা কালের কন্ঠের নিজস্ব রিপোর্ট।

13903203_1076844955737537_6731746360397840250_n

কালের কন্ঠের সেই প্রত্যক্ষ্যদর্শী নারী (নাম প্রকাশিত নয়) যে বক্তব্য দিয়েছেন আমরা সেই বক্তব্যের সাথে সত্য পল প্রকাশ ও সেই নারীর দুইজনের বক্তব্যকেও এই লেখাতে একজন আরেকজনের সাথে কথার মিল/অমিল সাপেক্ষে ক্রস চেক করে আপনাদের সাথে তুলে ধরবার চেষ্টা করব।

উল্লেখ্য যে এইখানে সত্য পল প্রকাশের পুরো জবানবন্দীওকে আমরা লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করেছি এবং কালের কন্ঠে সাক্ষাৎকার দেয়া সেই তরুনীর বক্তব্যকে আমরা নীল কালি দিয়ে চিহ্নিত করেছি আপনাদের বুঝবার সুবিধার্থে।  সত্য পল প্রকাশ তার ১৬৪ ধারার জবানবন্দীতে বলেছেন-

দিনটি ছিল শুক্রবার। আমি হলি আর্টিজান বেকারিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। সেখানে আমি আমার গাড়ি নিয়ে যাই। আমার গাড়ি সেখানে পার্কিং করি। রাত সাড়ে ৮টার দিকে আমি ভেতরেই ছিলাম। আমি সামনের দিকে মুখ করা কোণার দিকের টেবিলে বসি। এ সময় তন্ময় নামে আমার এক বন্ধুকে ফোন করি। সে আমাকে জানায়, খাবার মিস করতে চায় না; কিন্তু তার আসতে দেরি হবে। আমি পাস্তা ও কমলার জুস অর্ডার দেই। তারা আমাকে কমপ্লিমেন্টারি হিসেবে পাউরুটি ও সসেজ দিলো। আমি আমার বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

এই বক্তব্যের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তুলছিনা। তবে আমরা বিশ্বাস করি যে সত্য পল প্রকাশের সেই তন্ময় নামের বন্ধুটির সাথে আইন শৃংখলা বাহিনীর লোকেরা কথা বলেছেন, তাঁর ফোন লিস্ট বা কল লিস্ট চেক করে দেখেছেন এবং তন্ময় কি করেন বা তার পেশা কি এসব ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখেছেন। কেন তিনি সেদিন আসতে দেরী করেছিলেন সে বিষয়েও নিশ্চই খোঁজ নিয়ে দেখেছেন। আমরা এও বিশ্বাস করি যে সত্য পল প্রকাশ যে খাবার অর্ডার দিয়েছেন সেটি ক্রস চেক করে তার সত্যতা মিলিয়ে দেখেছেন আইন শৃংখলা বাহিনী এবং তাঁকে যে কমপ্লিমেন্টারী খাদ্য দেয়া হয়েছে সেটিও সংশ্লিষ্ঠ ওয়েটার এর সাথে ও কম্পিউটারে তাদের সংরক্ষিত রশিদ [যদি থাকে] ক্রস চেক করে মিলিয়ে নেয়া হয়েছে।

হঠাৎ আমি দুই তিনজন ছেলেকে দেখতে পাই। তারা ধাক্কাধাক্কি করে রেস্টুরেন্টের প্রধান গেট দিয়ে ঢুকছিল। এমন সময় একটা শব্দ শুনতে পেলাম, যা আমার কাছে বোমার শব্দের মতো মনে হলো। হঠাৎ ছয় সাতজন রেস্টুরেন্টের দিকে দৌড়ে এলেন। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। স্থবির হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। একজনকে পড়ে যেতে দেখলাম। একই সময়ে আমি আল্লাহু আকবারধ্বনি শুনতে পেলাম।

ধাক্কাধাক্কি করে ঢুকছিলো নাকি কাউকে ধাক্কা দিয়ে ঢুকছিলো? কেননা যখম সন্ত্রাসীরা রেস্টুরেন্টের মূল ফটকে ঢোকে তখন সত্য প্রকাশ বসে ছিলেন প্যাটিও তে। আসুন নীচে আমরা একবার সেদিনের টেবিল সেটিংস-টি দেখে নেই।

2016-08-12_22h38_262016-08-12_22h40_41টেবিল সেটিংস অনুযায়ী যদি বিবেচনা করি তাহলে বুঝতে পারা যাবে যে সত্য প্রকাশ ঘটনার শুরুতেই ঘটনার খুব কাছাকাছি ছিলেন। আবার ঠিক ঐ মুহুর্তে বা ওই মুহুর্তের কাছাকাছি সময়ের আমাদের কাছে যে এক্সক্লুসিভ ভিডিওটি রয়েছে সেই দুটিতে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই যে সন্ত্রাসীরা বরংচ ধমক দিয়ে ঢুকাচ্ছে কয়েকজনকে। এখানে ধাক্কাধাক্কি করে ঢুকানো কিংবা কাউকে ধাক্কা দিয়ে ঢুকানো এই দুইটি টার্মের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সত্য প্রকাশের জবানবন্দীতে সেটি সু-স্পস্ট নয়। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়িয়েই যায়- “ধাক্কাধাক্কি করে ঢুকছিলো নাকি ধাক্কা দিয়ে ঢুকছিলো” কেননা ঘটনার আগে হলি আর্টিজান বেকারীর একেবারে বাইরের মূল ফটক দিয়ে সন্ত্রাসীরা আস্তে আস্তে সুসজ্জিত ঢোকে বলেই অনেক রিপোর্টে এসেছে। একদম শুরুর দিকে জঙ্গীদের ভূমিকা কি ছিলো? আসুন দেখে নেই নীচের সংক্ষিপ্ত নেই ভিডিওটিতে-

আবার এই একই মুহুর্তে কালের কন্ঠে দেয়া সেই নাম না জানা তরুনী কি বলছেন? আসুন সেটিও এখানে নিয়ে আসি।

আমরা যেখানে ছিলাম সেখান থেকে তাদের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল।প্রত্যক্ষদর্শী এই তরুণী বলেন, ঘটনার রাতে ৮টা ১০ মিনিটের দিকে তিনি হলি আর্টিজানে যান। তাঁরা রেস্তোরাঁর বাইরের লনে বসে থাকা অবস্থায় রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে জঙ্গিরা সেখানে আক্রমণ করে। এরপর জঙ্গিরা অস্ত্রের মখে তাঁদের নিচতলায় নিয়ে যায়। সেখানে তাহমিদ ও হাসনাত করিমসহ ১২ জন একসঙ্গে জিম্মি অবস্থায় ছিলেন।

আমাদের এই বক্তব্যের পর পর-ই আমরা আবার ফিরে যাচ্ছি সত্য পল প্রকাশের বক্তব্যে।

লক্ষ্য করে দেখুন এখানে সত্য প্রকাশ বলছেন তার কাছে শব্দটি বোমার মত মনে হয়েছে। মানে দাঁড়াচ্ছে তিনি কোনটি বোমা, কোনটি গ্রেনেড কিংবা কোনটি গুলি এটির পার্থক্য নিরূপন করতে সক্ষম নন। এটাই হয়ত একজন সাধারণ মানুষের জন্য স্বাভাবিক ফিচার। আমরা সাধারণ মানুষেরা কোনটি গুলির শব্দ, কোনটি বোমার শব্দ কিংবা কোনটি গ্রেনেডের শব্দ এই ব্যাপারগুলো নিরূপন করতে অক্ষম থাকব এটাই স্বাভাবিক। আর যখন নিরূপন করতে অক্ষম থাকব তখন একটা জবানবন্দীতে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে বলবনা বা বলতে পারবনা যে কোনটা কিসের শব্দ। কিন্তু সত্য প্রকাশ তার স্টেটমেন্টের উদ্বৃত লাইনে প্রথমে বলেছেন যে একটি শব্দ উনার কাছে বোমার শব্দ বলে মনে হোলো যেটার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অনিশ্চিত আবার ঐ একই প্যারাতে তিনি দাবী করছেন যে তিনি কিছুক্ষণের মধ্যে গুলির শব্দ শুনতে পেলেন। সত্য প্রকাশ কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন যে ওটা গুলির শব্দ ছিলো?

আমি একটি পিলারের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করলাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমি একজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় মুখে হাত দিয়ে দৌড়াতে দেখি। তাকে দেখতে চীন, জাপান বা কোরিয়ার মতো দূর প্রাচ্যের দেশগুলোর নাগরিকের মতো মনে হচ্ছিলো। আমি সম্ভাব্য ঝামেলার আশঙ্কায় ওই জায়গা থেকে সরে যাওয়ার কথা চিন্তা করলাম। সেখানে এক শ্রীলঙ্কান দম্পতিও ছিল, যাদের আমি আগে থেকেই চিনতাম। তারাও ওই পিলারের পেছনে লুকাতে আসেন। জানালা দিয়ে এক হামলাকারীকে উদ্ধত অবস্থায় দেখলাম। সে ধারালো বস্তু দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা একজনকে কোপাচ্ছিল। আমি চোখ খুললাম। কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলাম, ওই দম্পতির দিকে এক হামলাকারী এগিয়ে এলো। সে বললো, লুকাবেন না, আমরা আপনার ক্ষতি করবো না। আপনারা ওখানে (পিলারের আড়ালে) নিরাপদ নন। দ্রুত বেরিয়ে আসুন। নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা বেরিয়ে এলাম। একজন আমাদের কাছে মোবাইল চাইলো। আমি তাকে মোবাইলটা দিয়ে দিলাম। শ্রীলঙ্কান দম্পতি (নারী) ব্যাগ ছুড়ে দিলো, সেটি গিয়ে হামলাকারীর কাছে পড়লো। হামলাকারী জানতে চাইলো আমি বাঙালি কিনা? আমি বললাম, ‘ইয়েস আমি বাঙালি’ (অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরাও সামান্য বাংলা বলতে পারতো এবং বাংলায় বেশিরভাগ কথাই বুঝতো)।

সত্য প্রকাশ পিলারের আড়ালে লুকোবার চেষ্টা করেছে কিন্তু লুকোতে পেরেছে কিনা এই জবানবন্দী থেকে একেবারেই স্পস্ট নয়। এই যে লুকোবার চেষ্টা তিনি করেছেন সেটি-ই বা কিভাবে করেছেন তিনি? তিনি কি মাটিতে শুয়ে পড়েছিলেন? তিনি কি ক্রল করেছিলেন, তিনি কি গুটি শুটি মেরে কানে হাত দিয়ে বা নিজের শরীর ভাঁজ করে জড়োসড় হয়ে বসে পড়েছিলেন? এই ব্যাপারটি তার জবানবন্দীতে নেই। যদিও একই প্যারার জবানবন্দী থেকে আমরা জানতে পাই যে তার পাশে এসে শ্রীলংকার এক দম্পতি এসে দাঁড়িয়েছেন এবং যাদের তিনি আগে থেকেই চেনেন ও জানেন। সত্য প্রকাশের এই বক্তব্য থেকে বুঝতে পারা যায় যে পিলারের পেছনে তিনি এমনভাবে লুকিয়ে ছিলেন যেখান থেকে তিনি আরেকটি দম্পতিকে দেখতে পান এবং তাঁদের যে চেনেন এই বোধশক্তিও তখন তার ছিলো।

আবার পিলারের পেছনে লুকিয়ে সত্য পল প্রকাশ জানালা দিয়ে এক উদ্ধত জঙ্গীকেও তিনি দেখেছেন। পিলারের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখেছেন নাকি উঁকি না দিয়েও সেই জানালা দেখা যায় আমরা শিওর না। সাধারণত পিলারের আড়ালে লুকোলে তো জানালার বাইরে কি হচ্ছে তা দেখতে পাবার কথা নয়। যাই হোক তিনি ঐ অবস্থাতে দেখলেন যে একজন জঙ্গী ধারালো কিছু একটা দিয়ে একজনকে কোপাচ্ছে। তিনি দেখতে পান নি যে সেই ধারালো বস্তুটি কি?

এই ধারালো বস্তুটি কি হতে পারে এই ব্যাপারে অবশ্য একটি ধারনা আমরা পেতে পারি চ্যানেল নাইনের সাংবাদিক ড্যানি দ্রং এর নেয়া একটি সাক্ষাৎকার থেকে। যেখানে এই রেস্তোরার একজন কর্মচারী লম্বা একটি তলোয়ারের কথা বলছেন। হতে পারে সত্য প্রকাশের দেখা সেই ধারালো বস্তুটি সেই কর্মচারীর বলা ধারালো তলোয়ার। সেই সাক্ষাৎকারটি এখানে রয়েছে-

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই সময় সত্য প্রকাশ চোখ বন্ধ করে ছিলেন। এই কথা খোদ সত্য প্রকাশ তার স্টেটমেন্টেই বলেছেন। লক্ষ করে দেখুন তিনি বলছেন-

আমি চোখ খুললাম। কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলাম, ওই দম্পতির দিকে এক হামলাকারী এগিয়ে এলো।

তার মানে দাঁড়াচ্ছে যে ওই দম্পত্তির দিকে, মানে তার পাশে থাকা শ্রীলংকার দম্পত্তিদের দিকে জঙ্গীটি এগিয়ে আসবার সময় তিনি চোখ খুলেছিলেন এবং তার আগ পর্যন্ত চোখ বন্ধ ছিলো। জবানবন্দী অনুযায়ী ব্যাপারটা তো সেটিই দাঁড়াচ্ছে। ঠিক নয় কি? আর যদি সেটি ঠিক-ই হয় তাহলে এর আগে বলা সব কথাই তো মিথ্যে হওয়ার কথা কারন তিনি পিলারের পেছনে লুকিয়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করে ছিলেন। তিনি আবার তার জবানবন্দীতে বলছেন-

হামলাকারীরা তাদের বাংলায় শুয়ে পড়তে বললো। আমি শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ওই শ্রীলঙ্কান দম্পতি তখনও দাঁড়িয়েছিলেন। তখন বন্দুকধারী ওই হামলাকারী আমাকে ভেতরে চলে যেতে বললো এবং আমাকে বাংলাদেশি অন্য লোকজনের সঙ্গে বসতে বললো। তারা আমাকে টেবিলে মাথা রেখে চেয়ারে বসতে বাধ্য করলো। টেবিলের নিচে দুটি মেয়ে লুকিয়েছিল। হামলাকারীরা তাদের বেরিয়ে এসে আমার পাশে বসতে বললো।

এইখানে একটা ব্যাপার স্পস্ট হয়েছে যে সত্য প্রকাশ পিলারের পেছনে ঠিক কিভাবে লুকিয়ে ছিলেন। এটা নিশ্চিত যে তিনি শুরুতেই শুয়ে পড়েন নি। জঙ্গীরা বলার পর তিনি শুয়ে পড়লেন। তার মানে এর আগ পর্যন্ত হয় তিনি বসে ছিলেন নয়তো দাঁড়িয়ে। এখন এই অবস্থা থেকে আমরা জানতে পাই যে জঙ্গীরা তাকে অন্য বাংলাদেশীদের সাথে তাদের বস্তে বললো এবং টেবিলে মাথা রেখে অর্থ্যাৎ হেড ডাউন পজিশন।

এখানে একটা ব্যাপার খুব লক্ষ্যনীয় যে ওই শ্রীলংকান দম্পত্তি জঙ্গীদের দিকে মোবাইলের ব্যাগ ছুঁড়ে দেয়, বসতে বললে বসে না দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু জঙ্গীরা কেউ কিছু বলে না বা বলেনি তাদের। ঐ দুইজন শ্রীলংকান কি ভালো বাংলা বলতে পারতেন? তাদের জাতীয়তা কি পরীক্ষা করেছে জঙ্গীরা? আশা করি এই দুইজন শ্রীলংকানদের জবানবন্দী আইন শৃংখলা বাহিনীর কাছে রয়েছে এবং তা অন্যদের সাথে ক্রস চেক করে দেখা হচ্ছে।

কিন্তু তার পর পর-ই যে তিনি বলছেন যে দুইটি মেয়ে টেবিলের নীচে লুকিয়ে ছিলো, এই দুইটি মেয়ে কারা? এরা কি ঐ যে শুরুতেই অস্ত্রের মুখে ভেতরে আসা তাহমিদের দুই বান্ধবী মালিহা এবং তানহা? এর জবাব আমরা সত্য প্রকাশের বক্তব্যে পাই না। চলুন তাহলে আমরা কালের কন্ঠে প্রকাশিত সেই নাম না জানা তরুনীর বক্তব্য শুনি যে তিনি কি বলছেনন-

রেস্টুরেন্টের নিচতলায় আমরা ১২ জন জিম্মি ছিলাম। তাহমিদসহ আমরা তিনজন, হাসনাত আংকেল এবং তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ চারজন, সত্য প্রকাশ নামের এক ব্যক্তি এবং রেস্টুরেন্টের একজন শেফ ও তিনজন ওয়েটার ছিল। আমরা তিনজন বাইরের লনে ছিলাম। আমাদের পাশেই কয়েকজন বিদেশি ছিল। হামলার পর প্রথমেই জঙ্গিরা তাদের নিয়ে মেরে ফেলে। তখন আমরা টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়ি। পরে জঙ্গিরা আমাদেরও মারতে আসে।তখন আমরা বাংলায় চিত্কার করে উঠি। সে সময় ওরা বলে, আমরা বাংলাদেশিদের মারব না, মুসলমানদের মারব না। এটা বলেছিল নিবরাস। পরে ছবি দেখে তাকে চিনেছি। ওই সময় মাঠে এসে একজন আল্লাহু আকবার বলে চিত্কার করে। আমরা পালানোর চেষ্টা করি। তখন একজন এসে ধমক দেয়। খুব চেষ্টা করলে হয়তো পালাতে পারতাম। তবে ভয়ে বের হইনি। ভয় হচ্ছিল, কোন দিক থেকে যেন গুলি করে দেয়। একপর্যায়ে বন্দুক হাতে জঙ্গিরা আমাদের লন থেকে রেস্টুরেন্টের ভেতরে নিয়ে যায়। নিয়ে বলে, এখানেই থাকো। সেখানে ছিল জঙ্গি রোহান ইমতিয়াজ ও খায়রুল ইসলাম পায়েল। মুক্ত হওয়ার পর পত্রিকায় ছবি দেখে তাদের চিনেছি।তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের ধমক দিয়ে সারা রাত টেবিলে বসিয়ে রাখে জঙ্গিরা। এক সময় তাহমিদ একটু মাথা উঁচু করে কী যেন বলতে চাইছিল, হয়তো ওয়াশরুমে যেতে চাইছিল, তখন খায়রুল একটি দরজা ভাঙার চেষ্টা করছিল। সেখান থেকে দৌড়ে এসে সে বাজে ভাষায় তাহমিদকে শাসায়। বলে, মাথা নিচু করে রাখ। মাথা উঠাইছস কেন? কোপ মেরে দেব তোরে।

লক্ষ্য করে দেখুন যে তরুনীর ভাষ্যে টেবিলের নীচে লুকিয়ে পড়বার ব্যাপারটি রয়েছে কিন্তু সেটি সত্য প্রকাশের ভাষায় যে রেস্টুরেন্টের ভেতরে যেখানে সব বাঙ্গালীকে জড়ো করে রাখা হয়েছিলো সেখানে নয় বরং বাইরের লনে যে গেজাবো/ ছাউনি ওয়ালা টেবিল অংশ রয়েছে (আপনারা টেবিল সেটিং টা আবার একটু উপরে লক্ষ্য করুন) সেখানকার টেবিলের নীচে তাহমিদ সহ সবাই লুকিয়ে পড়েছিলো)

তাহলে সত্য পল প্রকাশের বলা টেবিলের নীচে লুকিয়ে পড়া সেই মেয়ে দুইটি কে? তানহা ও মালিহা রেস্টুরেন্টের ভেতরের টেবিলে লুকায়নি এটা স্পস্ট কিংবা সেটির কারনও নেই। কেননা সবাইকে যদি জড়ো করে একটা যায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে সেখানে টেবিলে লুকিয়ে থাকাটা তো যৌক্তিক নয়। কারন জঙ্গীরাই সেখানে সব বাঙালীকে যেতে বলছে।

তবে যে স্থানে সব বাংলাদেশীদের জড়ো করা হয়েছিলো সেখানে এই দুইটি তরুনী মানে মালিহা ও তানহা’র থাকারই কথা কেননা এই কালের কন্ঠে সাক্ষাৎকার দেয়া তরুনী বলছে যে রেস্টুরেন্টের নীচ তলায় তাদের সাথে সত্য প্রকাশ ছিলো। সুতরাং সেখানে তাহলে মেয়ে বলতে এই দুই তরুনী আর হাসনাতের স্ত্রী ও তার মেয়ে এই চারজন ছিলো। তাহলে সত্য প্রকাশের বলা জবানবন্দীতে উল্লেখিত সেই দুই নারী কে যারা টেবিলের নীচে লুকিয়ে ছিলো? এটা কিন্তু রহস্যই থেকে যাচ্ছে। যদি এই দুই তরুনী মালিহা ও তানহা হয়ে থাকে তাহলে তাদের বক্তব্যের সাথে কিন্তু সত্য প্রকাশের বক্তব্য মিলছে না একেবারেই।

আবার লক্ষ্য করে দেখুন যে এই তরুনীর মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি যে সবাইকে এখানে মাথা টেবিলে দিয়ে নীচু করে থাকতে হয়েছিলো। একই বক্তব্য আমরা সত্য পল প্রকাশের জবানবন্দীতেও পাই। এখানে তরুনীর বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে যে তাহমিদ ওয়াশরুমে যেতে চাইলেও পায়েল নামে জঙ্গীটি তাকে ধমকাচ্ছে কিন্তু সত্য প্রকাশ বলছেন যে জঙীরা তাকে বাথরুমে যেতে দিয়েছেন। সমস্যা হয়নি। আসুন দেখি সত্য পল প্রকাশ এই ব্যাপারে কি বলছে-

এরপর তারা আমাদের পানি ও মাফিন খেতে দেয়। তারা আমাদের বাথরুম ব্যবহারও করতে দেয়। বাথরুমে যাওয়ার সময় আমি দেখি, সিঁড়ির গোড়ায় এক নারী পড়ে আছেন। সঙ্গে সঙ্গে নিজের মুখ ঢেকে ফেলি।

একজনকে পানি, মাফিন খেতে দিচ্ছে, বাথরুমে যেতে দিচ্ছে আবার তাহমিদকে যেতে দিচ্ছেনা। ঘটনা তাহলে কি? একই যাত্রায় দুই ফলাফল কেন? সত্য পল প্রকাশ আবার বলছে-

আমি পুরোপুরি আমার মাথা টেবিলে ঠেকিয়ে রাখতে পারছিলাম না, তখন  কেউ আমার মাথায় আঘাত  করে। ওই  মেয়েরা ও  এক  যুবক  হামলাকারীর  কাছে  অনুরোধ  করছিল  তাদেরকে  ছেড়ে  দেওয়ার জন্য।  হামলাকারী  জবাব দেয়,  ‘আমাদের  বিবেচনায়  আপনারা যদি  কাফের  না  হনতাহলে  আমরা  আপনাদের  কোনও  ক্ষতি করবো  না।  তারা  বলে যে, যারা কাফের নয় সেসব মানুষের কোনও ক্ষতি তারা করবে না।

একই ধাঁচের কথাও বলেছে সেই তরুনী। আসুন দেখে নেই তিনি কি বলেছেন-

“তখন আমরা বাংলায় চিত্কার করে উঠি। সে সময় ওরা বলে, আমরা বাংলাদেশিদের মারব না, মুসলমানদের মারব না। এটা বলেছিল নিবরাস। পরে ছবি দেখে তাকে চিনেছি”

“রাতে তারা আমাদের কিছুই বলেনি। সারা রাত মাথা টেবিলে দিয়ে চেয়ারে বসে থাকতে বলা হয়েছে। আমরা তাই করি”

সত্য প্রকাশের এবং সেই তরুনীর কথা অনুযায়ী একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে টেবিল থেকে মাথা উঠানোর ব্যাপারে সেদিন রেস্টুরেন্টে একটা কড়াকড়ি ছিলো যেটার জন্য সত্যকে মাথায় আঘাত-ও পেতে হয়েছে। পাঠক আপনারা এই বিষয়টা একটু মনে রাখবেন। সামনে এই মাথা নীচু করে রাখার ব্যাপারটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।

এই ভয়াবহ অবস্থাতে ঐ মেয়েরা ও যুবক তাদের ছেড়ে দেবার জন্য অনুরোধ করছিলো যেখানে মাথা তোলাই মানা। আবার এই কথা শুনে জঙ্গীরা বলেছে কাফের না হলে ক্ষতি নেই। এই কে কাফের আর কে কাফের না এই ব্যাপারটি জঙ্গীরা কিভাবে নিরূপন করেছে? সেটির কোনো তথ্য কিন্তু আমরা সত্য প্রকাশের বক্তব্যেই পাইনি। পাইনি সেই তরুনীর বক্তব্যেও।

একদল জঙ্গী যেখানে কে কাফের আর কে কাফের না এই মাপ কাঠিতে খুনো-খুনির কথা বলছে সেখানে কে কাফের আর কে কাফেরনা এই ব্যাপারটি তারা নিশ্চই নিরূপন করবে। তেমনটাই তো হবার কথা। পরীক্ষা না করে কিভাবে কাফের আর কাফের নয় নির্ধারিত হলো? সুতরাং এই দুইজনের জবানবন্দীতে এই সুনির্দিষ্ট ব্যাপারটি বেশ ঘোলাটে।

সত্য পল প্রকাশের জবানবন্দীর পরবর্তী অংশে আমরা দেখতে পাই যে তিনি বলছেন-

হামলাকারীদের  একজন  ইংরেজিতে বললোআপনারা কী জানেন, কিভাবে আমাদের মুসলিম ভাই ও বোনেরা সিরিয়ায় নির্যাতিত ও হত্যার শিকার হচ্ছেন। তারা ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় কথা বলছিল। আমি এক হামলাকারীর সঙ্গে  ইসলাম নিয়ে এক যুবককে কথা বলতে শুনি  (পরে  আমি ওই  যুবকের  নাম  জেনেছি  তাহমিদ)। তারা আমাদের মোবাইল ফোনের কল রিসিভ করতে বলে। আমি নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ করে ফেলি। একজন হামলাকারী আমার কাছে জানতে চায় মিডিয়ার  কিংবা পুলিশের কাউকে আমি চিনি কিনা। আমি জবাব দেই না। এ কথা শুনে এক মেয়ে তার মাকে ফোন করে লাউড স্পিকারে কথা বলে। সে তার মাকে বলে, আম্মা তাড়াতাড়ি বেনজির আঙ্কেলকে বলো, আমি এখানে (গুলশান) আটকে আছি। মেয়েটির মা তখনও ওই ঘটনা সম্পর্কে জানতেন না। এরপর আরেকটি ফোন বেজে ওঠে। আমার সামনে বসা এক ব্যক্তি লাউড স্পিকারে কথা বলেন। (পরে আমি জেনেছি তিনি হাসনাত)। ফোনে বলা কথাগুলো আমি মনে করতে পারছি না।

এই রকম একটা ভয়ংকর অবস্থায় তাহমিদ ইসলাম ধর্ম নিয়ে জঙ্গীদের সাথে গেঁজাচ্ছে যেখানে মাথা উঠালেই আঘাত পাবার সম্ভাবনা রয়েছে কিংবা জঙ্গীরা তেড়ে ফুঁড়ে আসছে। সত্য প্রকাশের এই বক্তব্য কতটুকু সত্য? কি আলাপ করছিলো তাহমিদ? সেটিও এই জবানবন্দীতে নেই। যেখানে জিম্মিদের মৃত্যুদশা কিংবা সংকটপূর্ণ সময় যাচ্ছে সেখানে তাহমিদ জঙ্গীদের সাথে ঠিক কোন সাহসে ধর্ম নিয়ে গ্যাজাচ্ছে?

আবার সবাইকে মোবাইল ফোন রিসিভ করতে বল্লেও সত্য প্রকাশ বলেছেন যে তিনি তার মোবাইল ফোন বন্ধ করে ফেললেন। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে এই একই জবানবন্দীর শুরুতেই তিনি বলেছেন যে তিনি তার মোবাইল জঙ্গীদের শুরুতেই দিয়ে দিয়েছিলেন। যদি শুরুতেই মোবাইল ফোন জঙ্গীদের দিয়ে দেয়া হয়ে থাকে তাহলে আবার কি করে সেই একই ফোন সত্য প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছিলেন? জঙ্গীরা কি একবার ফোন দিয়ে তারপর সেটি তাদেরকে ফেরত দিয়েছিলেন? আসুন সেই কথাটি আমরা এই পর্যায়ে আরেকবার দেখে নেই-

একজন আমাদের কাছে মোবাইল চাইলো। আমি তাকে মোবাইলটা দিয়ে দিলাম।

কি পাঠক? অসঙ্গতিগুলো কি চোখে পড়ছে? আমার কিন্তু পড়ছে। বেশ ভালোভাবেই পড়ছে। এই বিষয়ে সেই তরুনী কি বলেন কালেরকন্ঠের সাক্ষাৎকারে? আসুন দেখি-

তিনি বলেন, ‘রাতে ওরা (জঙ্গি) আমাদের মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। তবে ফোন নেওয়ার আগে বাসায় কথা বলতে দেওয়া হয়, লাউড স্পিকারে।

লক্ষ্য করে দেখুন, ফোন নেবার আগে কথা বলতে দিয়েছে লাউড স্পীকারে। আমি ঠিক বুঝলাম না জঙ্গীদের এত কি ঠেকা পড়েছে যেখানে তারা উন্মক্ত এবং খুন করতে এসেছে। এই খুন করতে এসে চা-পানি খাওয়ায়, সেহেরী খাওয়ায়, ফোন করতে দেয়। কাহিনি ঠিক পরিষ্কার না। আবার অন্যদিকে সত্য প্রকাশ বলে ফোন নিয়ে গেছে আগেই। একটার সাথে আরেকটা কাহিনী মিলে না। ফোনে আবার যেই কনভার্সেশন হচ্ছে সেটিও প্রশ্ন উদ্রেককারী। মেয়েটি ফোনে বলছে তার মাকে বেনজীর আংকেলকে জানাতে। এইটা কোন বেনজীর আহমেদ? র‍্যাবের প্রধান বেনজীর? যদি ধরে নেই র‍্যাবের বেনজীর সেক্ষেত্রে র‍্যাবের প্রধানকে জানাতে বলছে তরুনী আর জঙ্গীরা তাকে কিছুই বলেনি? এই ধরনের একটা ঘটনায় পুলিশকে বলতে বলছে, জানাতে বলছে এর জঙ্গীরা কান পেতে সেটি শুনে রইলো, ব্যাপারটি খুবই অদ্ভুত নয় কি?

যদিও এই পার্টিকুলার ইস্যুতে সেই তরুনী তার সাক্ষাৎকারে বলে-

আমাদের বলেছে, আপনাদের মারব না। আর পুলিশে কেউ চেনাজানা থাকলে ফোন করে বলেন, তারা (পুলিশ) যেন গুলি না করে। তারা গুলি করলে আমরা জানি না আপনারা বাঁচবেন কি না।

তাহলে তরুনী কি ফোন করে তার মাকে এই কথা বলেছিলো? সত্য প্রকাশের জবানবন্দীতে তো এই রকম কিছু নেই। এমনকি এই মেয়ে তার মাকে ফোন করে এই কথা বলেছে কিনা তাও তো এই সাক্ষাৎকারে নেই। কেন নেই? ফোন করবার এই সূবর্ণ সুযোগ, “পুলিশ না বুঝে তাদের প্রতি গুলি চালাতে পারে” এই আশংকার পরেও ফোনে সেটি ত্র মাকে না বলা বা সাক্ষাৎকারে সেটি না থাকা, সব মিলিয়ে ব্যাপারটা ঘোলাটে। একদল খুনী, উন্মক্ত, জঙ্গীদের এতটা মানবিক করে দেখানো হচ্ছে কেন?

বাংলাদেশীদের মারবে না, মুসলমানদের মারবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ কে বাঙালী কিংবা কে বাঙালী নয় সেটির প্রেক্ষিতে বাঁচা মরা নির্ধারিত হলে ইশরাত আখন্দ, ফারাজ হোসে্‌ন, অবন্তী এই তিন জনকে কেন মরে যেতে হোলো? তাদের ব্যাপারে একটা টু শব্দ নেই সত্য প্রকাশ ও এই তরুনীর বর্ণনায়। অথচ টেবিল সেটিংস লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই ইশরাত, ফারাজ, অবন্তী, তারিশী সবাই একই ফ্লোরে, মানে নীচ তলায় এক নাম্বার টেবিলে ছিলেন। তাদের কেন মারা হলো? তারা তো মুসলমান ছিলেন, বাংলাদেশী ছিলেন!!

জবানবন্দীতে এদের ব্যাপারে একটি কথাও কেন নেই? নেই সত্য প্রকাশের পক্ষ থেকে। নেই সেই নাম না বলা তরুনীর পক্ষ থেকেও।

আমরা পত্রিকায় পড়েছি যে হাসনাতের স্ত্রী বলছেন ফারাজকে জঙ্গীরা ছেড়ে দিতে চেয়েছিলো কিন্তু ফারাজ তার বন্ধুদের ছেড়ে আসবেনা বলেছে বলেই তাকেও মরে যেতে হয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো মাথা নীচু অবস্থায় যদি হাসনাতের স্ত্রী এইসব সব দেখে থাকেন বা শুনে থাকেন তাহলে অন্যদের জবানবন্দীতে এই বাংলাদেশী তিনজনের ব্যাপারে কিছু নেই কেন? কি রহস্য সেখানে? সত্য প্রকাশ চুপ, সেই তরুনী চুপ এই ব্যাপারে। কেন?

ফারাজের নানা লতিফুর ইত্তেফাক পত্রিকাকে বলেন-

এ প্রসঙ্গে ফারাজের নানা ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান বলেছেন, নামাজ-কালাম ফারাজের ভালো জানা ছিল। এটাও শোনা যাচ্ছে যে, জঙ্গিরা পবিত্র কোরআন শরিফের আয়াত পাঠ করতে বলেছিল। যারা বলতে পেরেছে, তাদের তারা ছেড়ে দিয়েছিল। ফারাজের তা না পারার কোনো কারণ নেই।

যদি ব্যাপারটা তাই-ই হয় তাহলে তো ফারাজের খুন হবার কোনো কারনই ছিলোনা। আর এই যে হথাৎ করে প্রচারিত হলো যে জঙ্গীরা সবাইকে সূরা, কলেমা জিজ্ঞেস করেছিলো সেসব সম্পর্কে সত্য প্রকাশ কিংবা তাহমিদের সেই বান্ধবী একটা কথাও বলেন নি। তাহলে হাসনাতের স্ত্রীর উদ্বৃতি দিয়ে হাসনাতের বাবা কি করে মিডিয়াকে বলেছিলো যে “যারা কলেমা বলতে পেরেছিলো বা সূরা বলতে পেরেছিলো তারাই মুক্তি হতে পেরেছিলো”

একটা বিশাল গ্যাং কি এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত? এটা কি বিশাল এক চেইন? এটা কি অনেকের সম্মলিত চেষ্টার ফলে সঙ্ঘঠিত কোনো ঘৃণ্য কর্ম?

এইখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন একটি বিষয় হচ্ছে হাসনাত ফোনে কার সাথে কি কথা বলেছিলেন সে কথা সত্য প্রকাশ মনে করতে পারছেন না। এত কথা মনে করতে পারেন সত্য প্রকাশ শুধু পারেন না হাসনাত কি কথা বলেছে সেটি। সেই তরুনী কি কথা বলেছে তা মনে রয়েছে, উপর থেকে নীচে কে কি বলেছে সে  কথা শুনেছে কিন্তু শুধু মনে নেই হাসনাতের লাউড স্পিকারে বলা কথাগুলো।

রহস্যময় নয় কি?

আর সত্য প্রকাশের বক্তব্য অনুযায়ী এই হামলার খবর তারা মোবাইলে পড়ছিলো আর হাসছিলো। তারমানে ইতি মধ্যেই যে খবরটি জানাজানি হয়েছে এটি সেখানকার সকলেই জানেন। তাহলে আদিখ্যেতা করে আলাদা করে তরুনীর বেনজীর আংকেলকে জানাবার জন্য কেন বলা? বেনজীর আংকেলের সাথে তরুনীর কি সম্পর্ক? বা তাদের পরিবারের?

সত্য প্রকাশের জবানবন্দীর আরেকটি অংশ চলুন দেখে নেই যেখানে তিনি বলছেন-

কিছু সময় পর আমি শুনতে পাই হামলাকারীরা রেস্তোরাঁর এক কর্মচারীকে বলছে, রান্নাঘরে যারা আছে তাদের দরজা খুলে বের হয়ে আসার কথা বলতে। হামলাকারীরা বাংলাদেশিদের  হত্যা করবে না বলে ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের আশ্বস্ত করেছিল ওই কর্মচারী । এরপর হামলাকারীরা কয়েকবার চেষ্টার পর কোল্ডরুম খুলতে সমর্থ হয়। ভেতরে দুই ব্যক্তিকে পাওয়া যায়। দুজনের একজন ছিলেন রেস্তোরাঁর এক কর্মচারী এবং অন্যজন ছিলেন একজন জাপানি। (জাপানি ভাষায় কথা বলছিলেন)। হামলাকারীরা বাংলাদেশিকে অন্যদের সঙ্গে বসতে দেয় এবং জাপানি নাগরিককে গুলি করে। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে যে, ওই জাপানি বেঁচে আছেন কিনা। জাপানি ব্যক্তি জবাব দেন, ‘হ্যাঁ। হামলাকারী আবার তাকে গুলি করে। গুলি করার আগে তারা আমাদের কানে হাত দিতে  এবং শিশুদের চোখ ঢেকে দিতে বলে।

হামলাকারীরা যে কয়েকবার চেষ্টা করে কোল্ডরুম খুলতে সক্ষম হয় সেটা হেড ডাউন করে থাকা জিম্মি সত্য প্রকাশ কিভাবে দেখলেন? নাকি তিনি জঙ্গীদের নির্দেশ মানছিলেন না? উনার তো এই ঘটনা এত ডিটেইল জানার কথাই না যে কয়বার চেষ্টা করলো নাকি করলো না। আবার কর্মচারি দুইজনের একজন ছিলেন জাপানি যেটা সত্য প্রকাশ সেই কর্মচারীর ভাষা শুনে বুঝে ফেললেন। যেখানে শুরুতে তিনি কে চীনা, কে কোরিয়ান কিংবা কে জাপানী নিরূপন করতে পারেন নি সেখানে তিনি ভাষা শুনে বুঝে ফেললেন যে এই ব্যাক্তি জাপানী? সত্য প্রকাশ কি জাপানী ভাষা বোঝেন? এই পরীক্ষা কি নেয়া হয়েছে?

তিনি আরো বলেন-

এক সময় আমি এক নারীর যন্ত্রণার গোঙানির শব্দ শুনতে পাই। কোপাতে থাকা ব্যক্তিটি বলছিল ‘মহিলা মরতেছে না’। আমি তাদের দেখি, দুটি বড় গ্যাস সিলিন্ডার কাঁচের দরজার দুপাশে রাখতে। তারা মোবাইল ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ব্যবহার করেছিল। তারা মোবাইল ফোন থেকে খবর পড়েছিল ও হাসছিল এবং জোরে জোরে বলছিল, ‘তারা আমাদের সন্ত্রাসী বলছিল, এখন আমাদের জঙ্গি বলছে। আগামীকাল আমাদের কী বলবে তারা জানেই না’। এক পর্যায়ে তারা (হামলাকারী) আমাদের বাংলায় একটি বার্তা (মেসেজ) পড়ে শোনায়। তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে এ বার্তা পাঠানো  হয়। বার্তাটি অনেক দীর্ঘ ছিল। সবটা আমার মনে নেই। তবে আমার মনে আছে এতে বলা হয়েছে, তারা খুব বড় কাজ করেছে, এ জন্য তাদের ভাইয়েরা  তাদের নিয়ে গর্বিত। এরপর তারা সেহরি খেতে দেয়। তাদের সন্দেহ এড়াতে আমি কয়েক কামড় খাই।

সত্য প্রকাশ কি জানেন যে যার ফোনে বার্তা এসেছিলো এটা তাদের থেকে নেয়া ফোনগুলোর একটি কিনা? এই ব্যাপারটি নিশ্চই গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখছেন বিশ্বাস করি।

সেহেরীতে কি খেতে দেয়া হয়েছিলো? কি খেয়েছিলেন তিনি সেহেরীতে? আমরা সংবাদপত্রের মাধ্যমে শুনেছিলাম যে সেখানে নাকি চিংড়ীর মালাইকারী, কোরাল মাছ, চা কফি সব দেয়া হয়েছিলো। খাবারের বর্ণনা নেই। থাকলে আরো অনেক কিছুই জানতে পারতাম। আগের তথ্যের সাথে মিলিয়ে দেখা যেতো। অবশ্য এই ব্যাপারটি কিছুটা পুষিয়ে দিয়েছেন সেই তরুনী। তিনি তার সাক্ষাৎকারে বলেন-

রাতের খাবারের ব্যাপারে জিম্মিদশা থেকে মুক্ত ওই তরুণী বলেন, ‘ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে শেফদের দিয়ে রান্না করায় জঙ্গিরা। সাহরির জন্য শুধু ফিশ ফ্রাই খেতে দেয়। জঙ্গিরা আমাদের সঙ্গে খায়নি। তারা বেকারি থেকে কেকও এনে দেয়।

একদল খুনে জঙ্গীদের এই আদর আর আপ্যায়ন বড় সন্দেহের। ঠিক যেমন সন্দেহের তাদের মানবিক করে দেখিয়ে চলবার সুক্ষ্ণ ব্যাপারটি। সত্য প্রকাশ তার জবানবন্দীতে বলছেন-

সেহরির পর তারা আবারও আমাদের টেবিলে মাথা রাখতে বলে। আমার  আবছাভাবে মনে পড়ে, কেউ একজন নির্দেশনা দিচ্ছিল। দুই ব্যক্তি (হামলাকারী) থাকবে ওপরের সিঁড়িতে, দুজন থাকবে সিঁড়ির নিচের দিকে। একজন কিছু একটা করবে যা আমার মনে পড়ছে না। পরে তারা দুই ব্যক্তিকে তাদের (হামলাকারীদের দিকে) কাছে আসতে বলে। আমি তাদের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখি। কিছু সময় পর তারা ফিরে আসেন এবং আমার সামনে টেবিলে মাথা নিচু করে বসেন।

এই দুই ব্যাক্তি কে? তাহমিদ এবং হাসনাত? সত্য প্রকাশ কেন তাদের নাম বলছেন না? একই যায়গায় বসে সেই তরুনী দেখে ফেললেন যে তাহমিদ আর তার হাসনাত আংকেলকে নিয়ে যাচ্ছে। তাহমিদকে পিস্তল দিচ্ছে গুলি খালি করে কিন্তু এসবের কোনো বর্ণনাই সত্য প্রকাশের জবানবন্দীতে নেই।

সত্য পল প্রকাশ কি কোনো কিছু এড়িয়ে যেতে চাইছেন? যদি চান তবে কেন চাইছেন? আর যদি না চান তবে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উনি নাম ছাড়া বক্তব্য দিচ্ছেন কেন? মাথা নীচু করে থাকা অবস্থায় তিনি দুনিয়ার বহুত কিছুর বর্ণনা দিলেন কিন্তু তাহমিদ আর হাসনাতের বেলাতে এসে চুপ মেরে গেলেন কেন? কি রহস্য?

সত্য প্রকাশ আরো বলেন-

এ সময় আমি একমাত্র হামলাকারীকে চলাফেরা করতে দেখি। আমি দেখি, টাক মাথার ব্যক্তি (হাসনাত) সামনের দরজা খুলছেন। আমি বাকি সবার সঙ্গে উঠে দাঁড়াই এবং তারা আমাদের ছড়িয়ে পড়তে বলে। হঠাৎ আমি দেখি, এক ব্যক্তি (হামলাকারী) তাহমিদকে পবিত্র কোরআন শরিফ দিচ্ছিল। কিন্তু তাহমিদ তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। আমি তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তারা আমাদের ফোন (টেবিলে ওপর রাখা) ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়। আমরা রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার জন্য হাঁটা শুরু করি। এটাই আমার জবানবন্দি।

এইবার কিন্তু আবার সত্য প্রকাশ পুরোনো ফর্মে। কে দরজা খুলছেন তিনি তা বলতে পারছেন। শুধু পারেন নি ইশরাত আখন্দ, ফারাজ হোসেন, আবিন্তা কবির কিংবা তারুশী জৈন এর কোনো খোঁজ। সেই তরুনীর বক্তব্যেওই এই ব্যাপারটি নিয়ে পুরো চুপ। যেন অল কোয়ায়েট অন দা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। তাহলে কি এই লোকগুলো কিছু দেখে ফেলেছিলো বা জেনে ফেলেছিলো এই পুরো ঘটনার কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু?

আবার লক্ষ্য করুন, উপরে যে কোরান শরীফের কথাটি রয়েছে এইখানেও একটা ব্যাপার আমার নজর কেড়েছে। সেটি হচ্ছে রেস্টুরেন্ট থেকে “জিম্মি দশা!!” থেকে বের হতে সত্য পল প্রকাশের হাতে একটা কাপড় জাতীয় কিছু দিয়ে কিছু একটা পেঁচানো ছিলো কিন্তু সেনাবাহিনীর কাছের আত্নসমর্পণের সময় তার হাতে সেই কাপড়টি নেই। কেন নেই? কাপড়টি তিনি কি ফেলে দিয়েছেন রাস্তায়? দিলে কেন ফেলে দিয়েছেন? (এটা যদিও এই জবানবন্দীর সাথে সম্পর্কিত নয়, তথাপিও প্রশ্নটি তুললাম আমার কাছে জরুরী মনে হয়েছে এটি মনে করেই)

সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সব শেষে শুধু এই টুকুই বলার রয়েছে যে তিনি কোনোভাবেই সন্দেহের উর্ধ্বের ব্যাক্তি নয়। তার জাতীয়তা, ধর্ম এগুলো নিয়ে নয় বরং সন্ত্রাসীদের দেশ নেই, জাত নেই এই কথা বিশ্বাস করেই বলছি যে এইসব অসম্পূর্ন বক্তব্য কিংবা বক্তব্যের এইসব মারাত্নক অসঙ্গতিগুলো নিয়ে খুব জরুরীভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

আজ আমি যে কথা এখানে লিখেছি হয়ত এইসব কথা নিয়েই কোর্টে অপর পক্ষের আইনজীবিরা সত্য প্রকাশ কিংবা সেই তরুনীকে জেরা করবেন কিংবা আমার থেকেও আরো সুক্ষ্ণভাবে প্রতিটি বক্তব্যের শব্দ নিয়ে জিজ্ঞেস করবেন। যদি সরকার আসলেই চায় এই নৃসংশ হত্যাকান্ডটির বিচার হোক, যদি সরকার আসলেই জঙ্গী নির্মূলে বদ্ধ পরিকর হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চই এই ব্যাপারগুলোর দিকে নজর দেবেন।

সত্য পল প্রকাশ-এর জবানবন্দীতে এই পরিমাণ অসংলগ্নতা অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে।

আজ প্রথম পর্বের সমাপ্তি। দ্বিতীয় পর্বে থাকবে কালের কন্ঠে সাক্ষাৎকার দেয়া সেই তরুনীর বক্তব্যের ব্যাপারে আমার মতামত নিয়ে বিশ্লেষন।